স্টাফ রিপোর্টার ।।
খুলনার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রাম এখনও থমথমে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকলেও আতঙ্ক কাটেনি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে। অনেকের বাড়িতে রান্না পর্যন্ত হয়নি। এদিকে মন্দিরসহ হিন্দুদের দোকানপাট ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে ঘাটভোগ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে রূপসা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শক্তিপদ বসু বাদী হয়ে রূপসা থানায় মামলা করেন। মামলায় ২৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১৫০-২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
রোববার শিয়ালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, হিন্দুদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক। সকাল থেকে পুলিশ ও র্যাব এলাকায় টহল অব্যাহত রেখেছে। এলাকায় এখনও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সকালে গ্রামের প্রধান সড়কের দু’পাশে দাঁড়িয়ে নীরব প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছেন গ্রামের মানুষ। অধিকাংশ বাড়িতে এদিন রান্না হয়নি।
গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে শিয়ালী পূর্বপাড়া মন্দির থেকে কিছু নারী ভক্ত কীর্তন করতে করতে শিয়ালী মহাশ্মশানের দিকে যাচ্ছিলেন। মাঝপথে একটি মসজিদ থেকে ইমাম ও কয়েকজন মুসল্লি মসজিদের সামনে কীর্তন করতে নিষেধ করেন। তখন তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। বিয়ষটি নিয়ে শনিবার থানায় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিকেল পৌনে ৬টার দিকে শতাধিক লোক দেশি অস্ত্র নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। এ সময় চারটি মন্দির, হিন্দুদের ছয়টি দোকান ও একটি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়।
যে বাড়িতে হামলা হয় সেই বাড়ির কর্তা শিবপদ ধর বলেন, ‘বিকেলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়িতে হামলা চালায় ৫০-৬০ জন লোক। প্রথমে তারা আমার নাম ধরে খুঁজতে থাকে। তখন আমি বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে বিলে গিয়ে আশ্রয় নিই। আমার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান বাড়িতে ছিল। তাদের সামনেই বাড়িঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। আমার বাবার স্মৃতিস্তম্ভটিও ভেঙে ফেলে। টয়লেট, চেয়ার-টেবিল কিছুই বাদ দেয়নি। ঘটনার পর থেকে বাড়ির সবাই আতঙ্কে রয়েছে।’
রবিবার সকালে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ, রূপসা উপজেলা আওয়ামী লীগ, খুলনা মহানগর ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় নেতাদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন গ্রামের মানুষ। পূজা উদযাপন পরিষদের রূপসা উপজেলা সভাপতি শক্তিপদ বসু বলেন, এখন পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকায় আমরা সন্তুষ্ট। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
রূপসা থানার ওসি মোশাররফ হোসেন বলেন, শনিবার রাতে মামলার পর রাতভর অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের ৯ জনই এজাহারভুক্ত আসামি। তারা হলেন- ঘাটভোগ ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের শরিফুল ইসলাম, সম্র্রাট মোল্লা, শিয়ালী গ্রামের মঞ্জুরুল আলম, বামনডাঙ্গা গ্রামের শরিফুল ইসলাম শেখ, রানা শেখ, মোল্লাহাট উপজেলার বুড়িগাংনী গ্রামের আকরাম ফকির, সোহেল শেখ, শামীম শেখ ও জামিল বিশ্বাস। এ ছাড়া বামনডাঙ্গা গ্রামের মোমিনুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে গতকাল ওই মামলা গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানান ওসি। তবে মামলার প্রধান আসামি শিয়ালী পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম নাজিম সমাদ্দারসহ মাসুম মল্লিক ও লিটন মল্লিককে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে ভাঙচুর করা মন্দির ও শ্মশানের সংস্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবাইয়া তাছনিম। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিগগিরই মেরামত কাজ শুরু হবে।
ঘটনাস্থলে খুলনার অতিরিক্তি পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার বলেন, পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে। এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করছে পুলিশ। এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত।








































