0 বিশেষ প্রতিনিধি
লাফিয়ে বাড়ছে করোনায় মৃত্যু ও শনাক্ত। প্রতিদিনই নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। একদিনে শনাক্তের হার ২৮ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে। টানা ৬ দিন ধরে মৃতের সংখ্যা একশ’র ওপরে। সংক্রমণ বৃদ্ধির মুখে জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে যথারীতি বাড়ছে রোগীর চাপ। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসার পাশাপাশি অক্সিজেন সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে খুলনা, বগুড়া, সাতক্ষীরায় হাসপাতালে অক্সিজেনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বগুড়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় অক্সিজেনের অভাবে ৭ জনসহ মোট ১১ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
খুলনায় ঘরে ঘরে সর্দি, কাশি ও জ্বরের রোগী মিলছে। ফলে খুলনায় অক্সিজেনের চাহিদা প্রায় চারগুণ বেড়েছে। গত বৃধবার সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেনের ফ্লো কমে যাওয়ায় আইসিইউ ইউনিটে ৩ জনসহ ৬ জনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এজন্য কর্তৃপক্ষ ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করেছেন।
খুলনা, বগুড়া, সাতক্ষীরা জেলায় অক্সিজেন সংকট নিয়ে কথা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়ার সঙ্গে। তিনি গনমাধ্যমকে জানান, সংশ্লিষ্ট জেলার হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। তারা তাকে জানিয়েছেন, অক্সিজেনের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। যেসব রোগী মারা গেছেন তারা অনেক বয়স্ক। হাসপাতালেও দেরিতে এসেছেন। এছাড়া তাদের আগে থেকে বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন। পরিচালক জানান, হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোক ইতিমধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
খুলনায় অক্সিজেন সিলিন্ডারের হাহাকার: খুলনা অঞ্চলে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফলে সময়মতো অক্সিজেন না পেয়ে অনেকে মারা যাচ্ছে। আর এ অবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার কে আগে নেবে, তা নিয়ে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রীতিমতো কাড়াকাড়ি চলে রোগীদের স্বজনদের মধ্যে। এমনটাই দেখা গেছে করোনার হটস্পট খুলনার কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে। সময়মতো অক্সিজেন না পেয়ে রোগী মৃত্যুর অভিযোগও বাড়ছে দিন দিন। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের স্বজনরা তৎপর আগে ভাগে অক্সিজেন সিলিন্ডার বাগিয়ে নিতে।
খুলনার সবচেয়ে বড় বিশেষায়িত হাসপাতালে ১৩০ শয্যার বিপরীতে গত কয়েকদিন ধরে রোগী ভর্তি থাকছেন ১৮০ থেকে ১৯০ জন। এখানে মাত্র ৭৭ টি শয্যায় রয়েছে কেন্দ্রীয় অক্সিজেনের সরবরাহ ব্যবস্থা, বাকি রোগীদের ভরসা সিলিন্ডার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচশ’ সিলিন্ডার মজুতের কথা বললেও হাহাকার থামছে না।
রোগীর এক স্বজন জানান, অক্সিজেনের সিলিন্ডার আমি নিজে ঘুরিয়ে আমার রোগীর পাশে রাখি। একটু পর এসে দেখি সেটা আরেকজন নিয়ে গেছে। আমাদের মতো যারা নরমাল পেসেন্ট তারা সিলিন্ডার পাচ্ছে না। আরেক করোনা রোগীর ভাই জানান, সিলিন্ডার না পেয়ে আমরা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছি।
করোনা প্রতিরোধ ও সমন্বয় কমিটির অন্যতম সদস্য ও মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ জানান, রোগীর এমন চাপ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রোগীর সংখ্যা যখনই ১৭০ অতিক্রম করছে তখনই সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হিসেবে সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল, বিভিন্ন সংগঠন আর ব্যক্তি পর্যায়ে শুধুমাত্র করোনা রোগীদের জন্য খুলনা শহরে বর্তমান দৈনিক সিলিন্ডারের চাহিদা ৭০০টি। তার বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৪১০টি। তারা জানান, ছোট সিলিন্ডারের চাহিদা প্রচণ্ড বেড়ে গেছে, প্রতিনিয়তই রাতের বেলা ফোন আসে। অনেককে দিতে পারছি, অনেককে বলছি পরে আসেন, গাড়ি এখনো আসেনি বা আসছে। হঠাৎ করে চাহিদা যদি একশ’র জায়গায় দুইশ’ হয়ে যায় সেটা চ্যালেঞ্জিং। ছোট সিলিন্ডারে ১ হাজার ৩৬০ আর বড় সিলিন্ডারে অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতা ছয় হাজার ৮০০ লিটার। চাহিদা আর সরবরাহের ভিতর ফারাকের দূরত্ব ক্রমশই বাড়ছে। যে পরিস্থিতি চলছে তাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার একসময় দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠতে পারে খুলনায়।
স্পেক্ট্রা অক্সিজেন কোম্পানির খুলনা বিক্রয় কেন্দ্রের ইনচার্জ সজীব রায়হান বলেন, হাসপাতালে বেড সংকটের বিষয়টি প্রচার হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এজন্য খুব বেশি সমস্যা না হলে তারা হাসপাতালে রোগী না নিয়ে বাসায় রেখে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করছে। এজন্য সামপ্রতিককালে ছোট সিলিন্ডারের চাহিদা বেড়েছে প্রায় চারগুণ। ওই কোম্পানির ১ দশমকি ৪ সাইজের সিলিন্ডার আগে যেখানে প্রতিদিন ৩০টি করে চলতো এখন সেখানে চলে একশ’রও বেশি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগে থেকেই একটি সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট থাকায় সিলিন্ডার অক্সিজেনে চাহিদা কিছুটা কম ছিল। কিন্তু রোগী বেড়ে যাওয়ায় সেখানেও এখন চাহিদা বেড়েছে। তবে সিলিন্ডার অক্সিজেনের চাহিদা নেই খুলনা জেনারেল হাসপাতালে।
খুলনায় জেলায় কোন জায়গায় অক্সিজেনের সমস্যা নেই বলে দাবি করেছেন খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ। তিনি গনমাধ্যমকে বলেন, এই জেলায় তিনটি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম রয়েছে। বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার রাখা আছে। লিন্ডে এবং স্পেক্ট্রা অক্সিজেন সরবরাহ করে আসছে। করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় শনিবার থেকে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে চালু হবে করোনা ডেডিকেটেড শাখা। সেখানে ১০টি আইসিইউ এবং ৩৫টি সাধারণ শয্যাসহ মোট ৪৫টি শয্যা থাকবে। তাদেরও সেন্ট্রাল অক্সিজেন রয়েছে।
বগুড়ায় হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সংকট:বগুড়ায় করোনা শনাক্ত এবং মৃত্যু সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এখানকার তিনটি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালেই অক্সিজেন এবং শয্যা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বগুড়ায় অক্সিজেনের অভাবে ৭ জনসহ মোট ১১ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়ায় করোনা বিশেষায়িত সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ জন রোগী মারা গেছেন। অক্সিজেন সরবরাহের সমস্যায় শ্বাসকষ্টের কারণে এই রোগীদের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো হচ্ছে মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল হাসপাতাল এবং বেসরকারি টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে অক্সিজেল লেভেল কমে যাওয়া আরও বেশকিছু মুমূর্ষু রোগী চিকিৎসাধীন আছে। তাদের অবস্থাও ভালো নয়।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার তিন হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীদের জন্য হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে মোট ২৩টি। এর মধ্যে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ২টি, শজিমেক হাসপাতালে ১১টি এবং বেসরকারি টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০টি। বর্তমানে বগুড়ার এই তিন হাসপাতালে রোগীর ধারণ ক্ষমতা ২০০ জন। সেখানে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সেখানে রোগী ভর্তি ছিল ২২৩ জন। এর মধ্যে ১০জন রোগীর অক্সিজেনের মাত্রা একেবারেই নিচের দিকে, যাদের হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হচ্ছে।
এদিকে রোগীর তুলনায় হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা অনেক কম। মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা মাত্র দু’টি। সেখানে যে পরিমাণ রোগী ভর্তি আছে তাতে অন্তত ২০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সংকটের একই চিত্র জেলার অন্যান্য হাসপাতালেও।
গত বছর মোহাম্মদ আলী হাসপাতালকে করোনা বিশেষায়িত ঘোষণা করার সময় আইসিইউ ও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা কোনোটাই ছিল না। পরে ৮ শয্যার আইসিইউ চালু করা হয়। কিন্তু হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার বরাদ্দ মিলেছে মাত্র দু’টি। কর্তৃপক্ষ জানান, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ছাড়া আইসিইউ শয্যা করোনা রোগীদের জন্য তেমন কাজে আসে না। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে আরও কমপক্ষে ২০টি করে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দরকার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন বরাদ্দ চেয়ে দফায় দফায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো বরাদ্দ মেলেনি। ফলে অক্সিজেন সংকট দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে।
বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিক আমিন কাজল গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, হাসপাতালে রোগীর যে পরিমাণ চাপ সেখানে অন্তত ২০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা প্রয়োজন, কিন্তু আছে মাত্র ২টি। এ কারণে চাহিদা অনুযায়ী রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অধিক শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে।











































