০ সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় শনিবার সকাল ছয়টা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সাতটি উপজেলার ৭৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় লকডাউন শুরু হয়েছে। প্রথম দিন কিছুটা শিথিল থাকলেও আজ রোববার সকাল থেকে সাতক্ষীরা শহরে কঠোর লকডাউন চলছে। তবে জেলা ও উপজেলা শহরের বাইরে ইউনিয়ন ও গ্রামের লোকজনের স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখা গেছে।
রোববার সকাল আটটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করতে বাধ্য করতে সাতক্ষীরা জেলায় পথে পথে পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়েছে। কলারোয়ার কাজির হাট ও তালা উপজেলার পাটকেলঘাটায় সীমান্তে দুটি চৌকি বসানো হয়েছে। সাতক্ষীরা শহরে কিছুসংখ্যক ইজিবাইক, ভ্যান, মাহেন্দ্র চলতে দেখা গেছে। বড় বড় বিপণিবিতান ছাড়াও অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। তবে অনেকে দোকানের একটি দরজা খুলে রেখেছেন। ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা পুলিশ এলে তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ও করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন পাঁচজন। সাতক্ষীরার দুটি সরকারি হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৪৩। ২৪ ঘণ্টায় ১৮৮ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৮৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
রোববার দুপুর ১২টার দিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ৪০ শয্যা করোনা ইউনিটে কোনো শয্যা খালি নেই। রোগী মেঝেতেও রয়েছে। নার্সরা রোগীদের কাছে গিয়ে সেবা দিচ্ছেন। তবে নারী ইউনিটে সামাজিক দূরত্ব কিংবা মাস্ক না পরে অনেকে এক স্থানে বসে কিংবা শুয়ে রয়েছে। শনিবার বিকেলে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হন করোনা ইউনিটের নারী ওয়ার্ডে মমতাজ বেগম। তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরা শহরে থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে তালা উপজেলার চৌগাছা গ্রামে। তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তাঁর স্বামী আবদুল গফ্ফার জানান, চিকিৎসাসেবায় কোনো ত্রুটি নেই। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতায়ও ঘাটতি নেই। কিন্তু প্রচ- গরমে এখানে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। বৈদ্যুতিক পাখার বাতাসও গরম।
পুরুষ ওয়ার্ডে কথা হয় কালীগঞ্জ উপজেলার চম্পাফুল গ্রামের সুমনি স্বর্ণকারের সঙ্গে। তাঁর স্বামী নবজীবন স্বর্ণকার (৬৫) করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বৃহস্পতিবার। চিকিৎসক ও নার্সরা রোগীর কাছে আসছেন ও খোঁজখবর নিচ্ছেন। একই ওয়ার্ডে ভর্তি আশাশুনি উপজেলার কলিমাখালী গ্রামের নজিরউদ্দিন (৮০)। পাশে বসে মেয়ে আমেনা খাতুন বাবার সেবা করতে করতে বললেন, চিকিৎসক ও নার্সরা সব সময় আসছেন। এখানের চিকিৎসাসেবা ভালো। সদর হাসপাতালের আট শয্যার সিসিইউতে রোববার চারজন করোনা রোগী ভর্তি ছিলেন। সরেজমিনে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, ১২০ শয্যায় রোগী রয়েছেন ৯৭ জন। তবে ময়লা ও দুর্গন্ধ আছে এসব ওয়ার্ডে। এখানে কথা হয় শ্যামনগর উপজেলার পাঁচশত গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হাই গাজীর সঙ্গে। তাঁর বাবা রহমত গাজী (৬৫) ভর্তি রয়েছেন এখানে। আবদুল হাই গাজী বললেন, চিকিৎসা ভালো পাচ্ছেন তাঁর বাবা। চিকিৎসক ও নার্স আসছেন নিয়মমতো। এরপর ডাকলেও পাওয়া যাচ্ছে। তবে পরিবেশ ভালো নয়।
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সংক্রমণের হার গত দুই দিনের চেয়ে কিছুটা কম। কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন।
বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় এবং বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় ৯৪ জনের মধ্যে ৫০ জন করে সংক্রমিত হয়েছেন। দুই দিনে শনাক্তের হার ৫৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। শুক্রবার থেকে শনিবারÍএই ২৪ ঘণ্টায় ১৮৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৮৯ জন সংক্রমিত হয়েছেন। এই দুই দিনে শনাক্তের হার ৪৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ফায়সাল আহমেদ বলেন, শনিবার রোগী ছিলেন ৩৬ জন। আজ রোববার রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ জনে। মেঝেতেও রাখতে হচ্ছে রোগী। এই পরিস্থিতির মধ্যে তাঁরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রচ- গরমে রোগী, চিকিৎসক ও নার্সদের জীবন ওষ্ঠাগত। কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা থাকলেও তা চালু নেই। এটি দ্রুত চালু করা দরকার। তবে বড় সিলিন্ডার দিয়ে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই করোনা ইউনিটে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু করা দরকার। করোনা ইউনিটে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) এবং আইসিউতে মনিটর দরকার।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক কুদরত-ই-খোদা জানান, ৫০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও চালু রয়েছে ২৫০ শয্যা। এরই মধ্যে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় করোনা রোগীদের জন্য ১২০ শয্যার একটি ইউনিটসহ আট শয্যার সিসিইউ চালু রাখা হয়েছে। শনিবার রোগী ছিল ১১৭ জন। আজ তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭ জনে। এ অবস্থায় করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু রয়েছে উল্লেখ করে কুদরত-ই-খোদা বলেন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাইফ্লো নাজাল ক্যানুলা রয়েছে ৩৮টি ও অক্সিমিটার রয়েছে ১০০টি ওপরে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুই মাস আগে ৫০টি ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ২০টি কনসেনট্রেটর চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি। এখনই কমপক্ষে ১০ জন চিকিৎসক ও ৩০ নার্স না হলে করোনা রোগীদের উন্নত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোহম্মাদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, লকডাউনের প্রথম দিন শনিবার কিছু সমস্যা ছিল। আমসহ অন্যান্য কাঁচা মাল পরিবহনে বিধিনিষেধ নেই। এ ছাড়া জরুরি রোগী আনা–নেওয়াও করা যাবে। এ জন্য হয়তো কিছু গাড়ি চলছে। তবে আজ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আগামীকাল স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে গ্রামসহ সব স্থানে লকডাউন আরও জোরদার করা হবে।
করোনা ও করোনার উপসর্গ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে করোনার উপসর্গ নিয়ে ২২৭ জন ও করোনার সংক্রমণ নিয়ে ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের তত্ত্বাবধায়ক কুদরত-ই-খোদা বলেন, কালীগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের রহিমা খাতুন (৭০) ও একই উপজেলার ফতেপুর গ্রামের ফতেমা খাতুন (৬০) করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। করোনায় মারা গেছেন শ্যামনগর উপজেলার বিড়ালক্ষ্মী গ্রামের গুলজান বিবি (৬০) ও একই উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের আয়েশা খাতুন (৬৭)।










































