চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া মারণ ভাইরাস করোনার অভিঘাতে বিপর্যস্ত পুরো বিশ্ব। এ ভাইরাসটি থেকে পরিত্রাণ পেতে গত বছরই বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ লকডাউন ঘোষণা করে। বাংলাদেশেও ২০২০ সালের ২৬ মার্চ লকডাউন শুরু হয়েছিলো; যা শেষ হয়েছিলো ৩০ মে। তবে চলতি বছরই ফের উর্ধ্বমুখী করোনার সংক্রমণ। যার কারণে দেশে লকডাউনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে করোনার সংক্রমণ হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ ভাইরাসটি রোধে দেশে ফের লকডাউনসহ ১২ দফা সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে লিখিতভাবে জানানো হয়। অধিদপ্তর মনে করে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
গত ডিসেম্বরের পর সংক্রমণের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকলেও চলতি মার্চের শুরু থেকে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দৈনিক শনাক্ত রোগীর হার সোমবারও ৯ শতাংশ পেরিয়ে গেছে, যা দুই মাস আগে ৩ শতাংশের নিচে নেমেছিল। দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আবার ১৭ শর ঘরে উঠেছে, যা এক মাস আগেও তিনশর ঘরে ছিল। গত দুই দিনেই (মঙ্গলবার-বুধবার) ২৬ জন করে মারা গেছেন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। দেশে করোনা শনাক্তের এক বছর পার হওয়ার পর দুই মাসের ব্যবধানে গত বুধবার আবারও হাজারের ঘরে পৌঁছায় শনাক্তের সংখ্যা। এরপর থেকে করোনা শনাক্তের সংখ্যা হাজারের নিচে নামেনি। রোববার (১৪ মার্চ) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১১৫৯ জনের করোনা শনাক্তের কথা জানিয়েছিল। সোমবার শনাক্ত হয়েছিল ১৭৭৩ জন। এটি ছিল গত ৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে মঙ্গলবার শনাক্তের সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭১৯ জনে। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৬ জনের। শনাক্ত বিবেচনায় গত ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ১০০ নমুনায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত বিবেচনায় প্রতি ১০০ জনে সুস্থ হয়েছে ৯১ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং মৃত্যু হয়েছে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মিনি কনফারেন্স রুমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও বর্তমানে করণীয় সম্পর্কে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১২টি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এগুলো হলো- ১. সম্ভব হলে কমপ্লিট লকডাউনে যেতে হবে। সম্ভব না হলে ইকোনমিক ব্যাল্যান্স রেখে যেকোনো জনসমাগম বন্ধ করতে হবে। ২. কাঁচা বাজার, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, শপিংমল, মসজিদ, রাজনৈতিক সমাগম, ভোট অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, পবিত্র রমজান মাসের ইফতার মাহফিল ইত্যাদি অনুষ্ঠান সীমিত করতে হবে। ৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেগুলো বন্ধ আছে সেগুলো বন্ধ রাখতে হবে। অন্যান্য কার্যক্রম সীমিত রাখতে হবে। ৪. যেকোনো পাবলিক পরীক্ষা (বিসিএস, এসএসসি, এইচএসসি, মাদ্রাসা, দাখিলসহ অন্যান্য) বন্ধ রাখতে হবে।
৫. কোভিড পজিটিভ রোগীদের আইসোলেশন জোরদার করা। ৬. যারা রোগীদের কন্ট্রাকে আসবে তাদের কঠোর কোয়ারেন্টিনে রাখা ৭. বিদেশ থেকে বা প্রবাসী যারা আসবেন তাদের ১৪ দিনের কঠোর কেয়ারেন্টিনে রাখা এবং এ ব্যাপারে সামরিক বাহিনীর সহায়তা নেওয়া ৮. আগামী ঈদের ছুটি কমিয়ে আনা ৯. স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে আইন প্রয়োজনে জোরদার করা ১০. পোর্ট অব এন্ট্রিতে জনবল বাড়ানো, মনিটরিং জোরদার করা, ১১. সব ধরনের সভা ভার্চুয়াল করা এবং ১২. পর্যটন এলাকায় চলাচল সীমিত করা।
এসব প্রস্তাবের পাশাপাশি কয়েকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও ৫টি প্রস্তাবনা দিয়েছেন। সেখানে তারা বলেছেন- বইমেলা বাতিল করতে হবে, বদ্ধস্থানে বা কক্ষে ইফতার পার্টি না করতে নির্দেশনা দিতে হবে, ঈদের ছুটি কমিয়ে ১ দিন করতে হবে, কক্সবাজারসহ পর্যটন এলাকায় যাতায়াত সীমিত করতে হবে এবং মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নামাজের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, শুধু শুধু লকডাউন দেবে বলে লাভ হবে না। লকডাউন দেয়ার মতো সক্ষমতা সরকারের নেই। গত বছরে পারেনি আর এখনও পারবে না। মূল গুরুত্ব দিতে হবে স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপরে এবং সেটি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। নির্দেশনা মানার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব দেয়া যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কি এমন কোন বাহিনী আছে যারা এই দায়িত্ব পালন করেত পারবে? তিনি উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, সেটা কি সরকার করতে পারবে?
সাবেক এই উপাচার্য বলেন, সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দিলে পারবে, তাদের সেই সক্ষমতা আছে। যদি সেটা করতে না পারে তাহলে বলে লাভ নেই। তাই মাস্ক পরতে হবে এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। তিনি আরও বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আগের মতো ভয়াবহ হবে না। তবুও সচেতনতাই বেশি দরকার। এবিষয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম প্রধান বলেন, করোনার সংক্রমণ রোধে ১২ দফা সুপারিশ মন্ত্রণালয় পেয়েছে। তবে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে আগের মতো কঠোর হওয়ার কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেছেন, মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে আবারও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসবে। মাস্ক না পরলে-স্বাস্থ্যবিধি না মানলে জরিমানা করা হবে। এ বিষয়ে জেলা পর্যায়ে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে ইতোমধ্যে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তাদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, আমাদের সিদ্ধান্ত যেগুলো ছিল, সেগুলো যেন প্রয়োগ করে। অর্থাৎ মোবাইল কোর্ট করে। যারা মাস্ক না পরে তাদেরকে জরিমানা করবে। নো মাস্ক নো সার্ভিস কর্মসূচিকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গেস্ট কন্ট্রোল করবে।
– বিশেষ প্রতিনিধি








































