হাবীব রহমান:
মুজিব বর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সেবায় নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বিস্তারের পাশাপাশি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণও ঘটেছে অনেক। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি, মুজিব বর্ষ আর আওয়ামী লীগ সরকারের টানা যুগপূর্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ পা দিয়েছে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। ২০২০ সালে মুজিব বর্ষের শুরু, মহামারি করোনার কারণে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সময় বেড়েছে। এর মধ্যে আগামী ২৬ মার্চ থেকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী-২০২১। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার লক্ষ্য, এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষ ঘর পাবে, তাদের ঠিকানা পাবে। বাংলাদেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হবে।
মুজিব বর্ষের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ ছিল গৃহহীনদের আশ্রয়। এ আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ লাখ গৃহহীনকে পুনর্বাসন করা হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারগুলোকে নানা ক্যাটাগরিতে ঘর দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে যেমন বাঙালি পরিবার রয়েছে, তেমনি আছে পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠীও। ভিক্ষুক, হরিজন, হিজড়াসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পেয়েছে মুজিব বর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার পাকা ঘর। পাশাপাশি মুজিব বর্ষে সারা দেশ আলোকিত হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রার সময়ের মধ্যেই দেশে বিদ্যুতায়ন হবে শতভাগ। যেসব জায়গায় গ্রিডলাইন রয়েছে সেখানে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ইতোমধ্যে শেষ হলেও যেসব জায়গা দুর্গম হওয়ায় গ্রিডলাইন নেওয়া সম্ভব নয় সেসব জায়গায় সোলার প্যানেল এবং সাবমেরিন কেবলের সহায়তায় সরকার বিদ্যুৎ পৌঁছে দিচ্ছে। মুজিব বর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ স্পর্শ করেছে আরেকটি মাইলফলক। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির চেয়ার টেফারি টেসফাসো গত শুক্রবার রাতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে সিডিপির পাঁচ দিনব্যাপী ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভা শেষে এই ঘোষণা আসে।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। বাংলাদেশ দ্বিতীয় বারের মতো মানদণ্ডগুলো অর্জন করেছে।
মুজিব বর্ষে দেশব্যাপী তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ৫৬০টি মডেল মসজিদ। প্রতি জেলা-উপজেলায় ৪০ শতাংশ জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে চার ও তিন তলাবিশিষ্ট মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
একসঙ্গে এত মসজিদ নির্মাণের ঘটনা দেশে এই প্রথম। মডেল মসজিদ প্রকল্পের পরিচালক নজিবর রহমান বলেন, পদ্মা সেতুর মতো এটিও একটি বড় প্রকল্প। দেশের দ্বিতীয় বড় প্রকল্প এটি, যা সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে।
সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে এসব মসজিদ। অত্যাধুনিক এসব মসজিদে থাকছে হজ নিবন্ধন, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের ট্রেনিং সেন্টার, শিশুদের আরবি শেখার সুযোগ, মরদেহ গোসল, অটিজম কর্নার, শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্রসহ বিশাল হেফজখানা। এরই মধ্যে অনেক মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। মার্চের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যে বেশ জোরেশোরেই চলছে কাজ। আধুনিক নির্মাণশৈলী আর নান্দনিক এই মসজিদগুলোর ১৭০টির উদ্বোধন হবে এ বছরেই। এপ্রিলের প্রথম পর্যায়ে ৫০টি মসজিদের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মুজিব বর্ষের উপহারস্বরূপ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ১২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পঁচাত্তরপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত ছিল।
মুজিব বর্ষের উপহার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই প্রথম ই-পাসপোর্ট চালু করে। গত বছরের ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। মুজিব বর্ষে গত এক বছরে বন বিভাগের মাধ্যমে দেশে মোট ৮ কোটি ৬১ লাখ ৬২ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, এসব গাছ জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, কার্বন নিঃসরণ প্রশমন, অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি, খাদ্য-পুষ্টিসহ দেশের বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধিসহ দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মুজিব বর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি সেবার মানেরও উন্নয়ন হয়েছে। বিভিন্ন খাতে নতুন নতুন সেবাও যুক্ত হয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে প্রায় ২০ বছর পর গত শনিবার আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি চলাচল শুরু হয়।
ফলক উন্মোচনের পর নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুনরায় এ সার্ভিস চালু মুজিব বর্ষের উপহার। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেবা খাত মুজিব বর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন সেবা সহজীকরণ করে এবং জনসম্পৃক্ত নতুন নতুন সেবা চালু করে। মুজিব বর্ষ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে রেমিট্যান্সের জোয়ারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও নতুন রেকর্ড হয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক (৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার) অতিক্রম করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক শূন্য দুই বিলিয়ন ডলার, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী শুরুতেই বলেছিলেন, জনগণের বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম তুলে ধরা এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সেবা ত্বরান্বিত করাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কর্মসূচির লক্ষ্য।-সময়ের আলো











































