নিজের জমিতে নিজের ঘর
–জিনাত আরা আহমেদ
স্বামী পরিত্যাক্তা আমেনা বেগম। প্রতিবন্ধী সন্তান রহমানকে কোলে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে। একদিন গ্রামের লোকের কাছে জানতে পারে সরকার গরীব অসহায় মানুষের জন্য ঘর তৈরি করে দেবে। এ কথা শুনে আমেনা স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করে। প্রতিবন্ধী শিশুর কথা বিবেচনা করে চেয়ারম্যান সাহেব দ্রুত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে আমেনার জন্য ঘর তৈরির প্রস্তাব আশ্রয়ন প্রকল্পের লিস্টে অন্তর্ভূক্ত করে দেন। নিজের জমিতে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘরে আমেনা তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে এখন ভালই আছে।
মুজিববর্ষে ছিন্নমূল ৬৬ হাজার একশত ৮৯টি পরিবারকে জমিসহ ঘর উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খুলনা বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর এ উপহার পেয়েছেন ৩ হাজার দুইশত ২৫টি পরিবার। ২৩ জানুয়ারী প্রথমবারের মত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সিং এ যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের কাঁঠালপাড়া গ্রামে একশত চল্লিশ জন উপকারভোগীর সাথে মতবিনিময় করেন। এসময় তিনি দেশের ৬৪ জেলার ৪১২টি উপজেলাতে একযোগে জমিসহ ঘর হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। মুজিববর্ষে ২১টি উপজেলায় ৭৪৩টি ব্যারাক নির্মাণের মাধ্যমেও ৩ হাজার সাতশত ১৫টি পরিবারকে পূনর্বাসন করা হয়েছে। একক গৃহ ও ব্যারাকের মাধ্যমে একসাথে ৬৯ হাজার ৯০৪টি পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদানের ঘটনা বিশে^ এটিই প্রথম।
সংবিধানের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়া ছিল বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। ক্ষুধামুক্তিতে বাংলাদেশ আজ সারা বিশে^র রোলমডেল। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্রমোন্নতি জীবন মানে পরিবর্তন এনেছে। তৈরিপোশাক রপ্তানী খাতে বড় ভূমিকা রাখছে, তাই বস্ত্র সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েও অনেকের কাছে বিলাসেরও উপকরণ। বাসস্থান তথা মাথাগোঁজার ঠাঁই সব মানুষের আজন্ম স্বপ্ন, এটা অবধারিতভাবেই মৌলিক চাওয়া। দেশের ছিন্নমূল মানুষের এই চাওয়াটুকু পূরণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সারাদেশে তৈরি হয়েছে জমিসহ ঘর।
স্বাধীনতার আর এক নাম মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকা। দেশের মানুষের মর্যাদাকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। অসংখ্য আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বঙ্গবন্ধু মৌলিক বিষয়ে দৃষ্টি দিয়েছিলেন। প্রথমেই তাঁর বিবেচনায় ছিল জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি জানতেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে মানুষ নিজেই তার প্রয়োজনকে অনুভব করবে। খাবার পেলে বস্ত্র থাকবে তখন সে থাকার জন্য উপায় খুঁজে নেবে। কিন্তু বাস্তবে সবার জন্য সেটা সম্ভব হয় না। কষ্ট করে একখন্ড জমি জোগাড় করা গেলেও বাড়ি করা যেন স্বপ্নই থেকে যায়। তার সাথে আছে জমির দলিল, নামপত্তনের মত বিষয় যা স্বল্পশিক্ষিত বা দরিদ্র মানুষের জন্য সূদুরপরাহত।
অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের প্রান্তিক মানুষের থাকার জন্য আবাসনকে নতুন মানে উন্নীত করেছেন। ছিন্নমূল, তৃণমূল সব পর্যায়ের মানুষের স্বপ্ন এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাওয়া পাওয়ার সাথে এক হতে চলেছে। সরকারী খাস জমি অনেক সময় অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রনে থাকায় সেখানে সাধারণ মানুষের আশ্রয় মেলে না। সরকারি উদ্দ্যোগে এসব দখলিকৃত জমি উদ্ধার করে ছিন্নমূল মানুষের জন্য আবাসন নির্মাণ করা হয়েছে। উপকারভোগী পরিবারের প্রত্যেককে দুই শতক সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদানপূর্বক দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সেমিপাকা একক ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। ভিক্ষুক, দিনমজুর থেকে শুরু করে শ্রমিক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ভেজাল মানসম্মত বাসস্থান বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় আজ জীবন্ত বাস্তবতা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পরে অসহায় মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭২ সালের ২ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলার (বর্তমান লক্ষ্মীপুর) চরপোড়াগাছা গ্রাম পরিদর্শনে যান এবং ভূমিহীন, গৃহহীন, অসহায় মানুষের পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে কক্সবাজার জেলাসহ পাশর্^বর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হওয়ায় বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐ এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখে এসব গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। গড়ে ওঠে আশ্রয়ণ প্রকল্প। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯৯৭ হতে ডিসেম্বর/২০২০ সাল পর্যন্ত সময়ে সর্বমোট ৩,২০,০৫২টি পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে।
“দেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না” মর্মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় আশ্রয়ণ-২ (জুলাই ২০১০-জুন ২০২২) নামে একটি প্রকল্পের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পে চরাঞ্চলে সিআইশিট ব্যারাক নির্মাণসহ ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলা আক্রান্ত এলাকার জন্য পাকা ব্যারাক, অন্যান্য অঞ্চলের জন্য সেমি-পাকা ব্যারাক এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারদের জন্য তাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিশেষ ডিজাইনের গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পুনর্বাসিত ভূমিহীন, গৃহহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও ছিন্নমূল পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে ভুমির মালিকানা স্বত্বের দলিল/কবুলিয়ত সম্পাদন,রেজিষ্ট্রি ও নামজারী করে দেয়া হয়।
মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষ্যে দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য গৃহ প্রদান নীতিমালা ২০২০ প্রণয়ন করা হয়েছে। ব্যারাকে পুনর্বাসিত হওয়ার পর পরই প্রতিটি পরিবারকে ০৩ মাস মেয়াদী ভিজিএফ সুবিধা প্রদান করা হয়। পুনর্বাসিত পরিবারের জন্য কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণ, কবরস্থান, পুকুরসহ প্রকল্প এলাকার উপকারভোগীদের সুবিধার্থে অভ্যন্তরীন রাস্তা নির্মাণ এবং পাকা রাস্তার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সংযোগ রাস্তা নির্মাণ করা হয়। সবুজায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি প্রকল্প গ্রামে ফলদ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ করা হয়ে থাকে। এখানে বসবাসরত উপকারভোগীদের জীবনমান সহজীকরণের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা রয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসিত পরিবারের সদস্যদের স্বনির্ভরতা অর্জনে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক কর্মকান্ডের জন্য ব্যবহারিক ও কারিগরী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হয়। নিজের জমি, নিজের ঘর, নিজের আয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে আশ্রয়ণ প্রকল্প একজন মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা। এ মহতী উদ্দ্যোগ যেন সব মানুষকে উন্নয়নের মহাসড়কে অবাধ বিচরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছে।
লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা। (পিআইডি ফিচার)










































