বাগেরহাট প্রতিনিধি।।
বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে মারামারি ও হট্টগোলের পর শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় কক্ষটি থেকে পুলিশ দুজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
ঘটনা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে শ্রমিক নেতাদের দুটি গ্রুপের। গতকাল মঙ্গলবার রাতে দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে দুই পক্ষ বাগেরহাট প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে।
তবে মঙ্গলবারের ঘটনায় বুধবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। এদিকে ঘটনার পর রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ আজিম ভূঁইয়াসহ চারজনকে আটক করেছে।
আটকদের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতাসহ দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে পুলিশ সূত্র বলছে, তাদের ডোপ টেস্ট (মাদক পরীক্ষা) করা হয়েছে।
অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাগেরহাট আন্তঃজেলা বাস, মিনিবাস, কোস ও মাইক্রোবাস শ্রমিক সভাপতি আবুল কাশেম ভূঁইয়া ওরফে সেলিম ভূঁইয়া অভিযোগ করে বলেন, সন্ত্রাসীরা তার ভাই আজিম ভূঁইয়াকে হত্যার উদ্দেশে অস্ত্র নিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের অফিসে প্রবেশ করেছিল। তবে তারা তাদের ধরে ফেলে।
অন্যদিকে ইউনিয়নের সহসভাপতি খান মোখলেছুর রহমান অভিযোগ করেন, ইউনিয়নের মাসিক মিটিংয়ে গেলে আজিম ভূঁইয়া ওরফে কানা আজিমের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী তাদের ওপর হামলা করে এবং দুজনকে আটকে রেখে পিটিয়ে ও কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। সন্ত্রাসীরা অস্ত্র বের করেছিল তাদের মারতে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, বাস টার্মিনালে শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে ৫ আগস্ট-পরবর্তী শ্রমিক দলের দুটি গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। কয়েক মাস আগে সেখানে ২২ সদস্যের নতুন একটি টার্মিনাল কমিটি হয়েছে। কমিটি বাসপ্রতি প্রতিদিন ১০ টাকা চাঁদা সংগ্রহ করে। গতকাল মঙ্গলবার টার্মিনাল কমিটি চাঁদার প্রায় ৬৫ হাজার টাকা কমিটির ২২ জনসহ ৪১ জনকে ভাগ করে দেন। এ নিয়ে একটি পক্ষের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয়। যার জন্য গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় হোয়াটস্ অ্যাপ গ্রুপে ‘ইউনিয়ন কার্যালয়ে বিশেষ সভা’ ডাকা হয়। পূর্ব বিরোধ ও টার্মিনালের চাঁদা ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে মঙ্গলবার রাতে ঘটনার সূত্রপাত। এ সময় প্রতিপক্ষের মারধরে দুজন গুরুত্বর আহত হন। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। ইউনিয়ন কার্যালয় থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ১টি রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার কিছু পরে শহরে বিভিন্ন সড়কে ১৫-২০টি মোটরসাইকেলযোগে অস্ত্রধারী একদল যুবককে চক্কর দিতে দেখা যায়।
আহতরা হলেন শ্রমিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ মেহেদী হাসান ও শহীদ নামে অপর শ্রমিক নেতা। তাদের জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চিকিৎসাধীন শহীদ বলেন, আজিমের ছোট ভাই মাসুক স্টান্ডের পাশের আল-আমিন হোটেলে চার-পাঁচটা রুম নিয়ে কয়েকজন ছেলেপেলে নিয়ে থাকে। সেখানে ধরে নিয়ে এরে-ওরে আটকায়, টাকা-পয়সা ছিনতাই করে। বিভিন্ন রকম অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। আমার ইট-বালুর গোলার কর্মচারীর ছেলে মিরাজের কাছ থেকে মঙ্গলবার ৬ হাজার টাকা ও মোবাইল নিয়ে যায় এবং মারধর করে। আমাকে বললে আমি শ্রমিক ইউনিয়নে যাই তার বড় ভাই সেলিম ভূঁইয়াকে বিষয়টি বলতে। সেখানে গিয়ে দেখি রুমে কিছু ছেলেপেলে বসা। আজিম তখন রুমের বাইরে। আমার সঙ্গে তখন ছিনতাইয়ের শিকার মিরাজ ছেলেটা ছিল। মাসুক তখন বুঝতে পারে আমি নালিশ করতে এসেছি। এরই মধ্যে নিচে চিৎকার শুনতে পাই। আর ধুম করে দরজা আটকিয়ে দেয় এবং গালাগাল ও মারধর শুরু করে। আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে মেহেদীকেও মারধর করে।
তবে সেলিম ভূঁইয়ার ভাষ্য, মোখলেছ খানরা মূলত আওয়ামী লীগের দোসর। তার তিন ভাই যুবলীগ-শ্রমিক লীগ। তাই মোখলেছ খানকে কমিটিতে (টার্মিনাল) রাখতে পারিনি। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে আমার ভাইকে গুলি করে মারতে আসছিল। আমি বাইরে ছিলাম, আমাকেই উদ্দেশ করে মারতে আসছিল। আমাকে না পেয়ে আজিম ভূঁইয়াসহ অন্যদের গুলি করার উদ্দেশে যখন পিস্তল বের করছে, তখন ওরা ধরে ফেলছে। আমি জানতে পেরে প্রশাসনকে জানাই। পুলিশ আসার আগে তারা পালিয়ে যায়। দুজন অস্ত্রসহ ধরা পড়ে। বিএনপির কিছু লোকজনের ছত্রচ্ছায়ায় তারা এই কাজগুলো করতেছে।
আর পাল্টা অভিযোগ করেন খান মোখলেছুর রহমান। তিনি দাবি করেন সেলিম ভূঁইয়ারা আসলে বিএনপি ও শ্রমিক দলের কেউ না। এরা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ করেছে। আজিম ভূঁইয়া স্টান্ডের পাশে একটি হোটেলে নির্যাতন কেন্দ্র বানিয়েছে। তারা এখানে সব সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি করছে।
তার ভাষ্য, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে শ্রমিক ইউনিয়নের মাসিক সভার জন্য আমিসহ নেতাকর্মীরা বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখানে থাকা সন্ত্রাসী আজিম ভূঁইয়া ওরফে কানা আজিম, তার ভাই সেলিম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা আমাদের শ্রমিকদের উপর অতর্কিত হামলা করে। দা-কুড়াল-হকি ও দেশীয় অস্ত্র ছিল তাদের কাছে। আমাদের শ্রমিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ মেহেদী হাসান, যিনি কালেকশন করেন, তাকে ধরে অফিসের ভেতরে নিয়ে যায়। তাকে মারধর করে। মাথা, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপায়। একপর্যায়ে অস্ত্র বের করে মেহেদী হাসানকে গুলি করতে যায়। কিন্তু অনেক শ্রমিক চলে আসায় অস্ত্রটি পড়ে যায়। পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা এসে তাদের উদ্ধার করে এবং অস্ত্রটি জব্দ করে।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম বুধবার বিকালে বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গ্যাঞ্জামের খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে আহত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে। এ সময় কক্ষটি থেকে পরিত্যক্ত একটি বিদেশি পিস্তল ও একটি রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্রের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।











































