তালা প্রতিনিধি।।
একসময় যে বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করতেন আনছার মোড়ল, সেই বাড়িতে এখন আর কেউ থাকেন না। পরিবারে পুরুষ সদস্যদের কেউ নেই। বাড়ির উঠানে মানুষের আনাগোনা নেই। নেই শিশুদের ছোটাছুটি। বসতভিটাটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কয়েক বছরের ব্যবধানে আনছার মোড়লসহ পরিবারের সাত পুরুষ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, তারা সবাই আর্সেনিকজনিত ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র পুত্রবধূ দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। একসময় একটি পরিবারের আশ্রয়স্থল হয়ে থাকা বাড়িটি এখন গ্রামের মানুষের কাছে আর্সেনিকের ভয়াবহতার এক করুণ চিহ্ন।
বাড়িটি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি আটঘরা গ্রামে। আনছার মোড়লের পরিবারের এমন পরিণতি এখানে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে স্বজন হারানোর গল্প। কোনো পরিবার হারিয়েছে উপার্জনক্ষম সদস্যকে, কোনো পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ একাধিক মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, গত দেড় দশকে আর্সেনিকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গ্রামের শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে এই মৃত্যুর সংখ্যা কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে আর্সেনিকের সরাসরি সম্পর্কের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
আনছার মোড়লের পরিত্যক্ত বাড়ির পাশেই থাকেন শফিকুল ইসলাম। তার জীবনেও আর্সেনিকের প্রভাব রেখে গেছে গভীর ক্ষত। গত এক দশকে বাবা, মা, চাচা ও স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি।
শফিকুলের দাবি, তাদের মৃত্যু হয়েছে আর্সেনিকজনিত ক্যানসারে। যে রোগে স্বজনদের হারিয়েছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন, সেই আর্সেনিকজনিত জটিল চর্মরোগের উপসর্গ এখন নিজের শরীরেও বহন করছেন।
একসময় পরিবারের সদস্যদের অসুস্থ হতে দেখেছেন শফিকুল। তাদের চিকিৎসা ও মৃত্যুর অভিজ্ঞতার পর এখন নিজের শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় তার উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পরিবারের মানুষগুলোর অনুপস্থিতি প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় সেই দুঃসময়ের কথা। নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে, সেই অনিশ্চয়তাও তাকে তাড়া করে।
শফিকুলের মতো পাশের পাড়ার রেখা বেগমের জীবনও বদলে দিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও স্বজন হারানোর বেদনা। কয়েক বছর আগে তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। রেখার দাবি, স্বামী আর্সেনিকজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। বর্তমানে নিজেও জটিল চর্মরোগে ভুগছেন। দীর্ঘদিনের রোগের যন্ত্রণা নিয়ে তাকে সংসারের বাস্তবতার সঙ্গেও লড়তে হচ্ছে।
কৃষ্ণকাটি আটঘরার বিভিন্ন বাড়িতে গেলে এমন আরও অনেক মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। কারও হাত-পায়ের চামড়া অস্বাভাবিকভাবে মোটা হয়ে গেছে, কারও শরীরের বিভিন্ন অংশে কালো দাগ, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগছেন।
আক্রান্তদের অনেকে বছরের পর বছর চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ স্থানীয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, কেউ অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে যাচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেকে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না।
গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, এখানে আর্সেনিক এখন আর শুধু পানিদূষণের একটি সমস্যা নয়; এটি বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, জীবিকা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করছে। রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবারের কর্মক্ষম সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের আর্থিক সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
রক্তস্বল্পতা: আয়রন খেলেই কি সমস্যার সমাধান?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্সেনিকযুক্ত পানি ফুটিয়ে আর্সেনিকমুক্ত করা যায় না; বরং পানির পরিমাণ কমলে আর্সেনিকের ঘনত্ব বাড়তে পারে।ফিটকিরি দিয়ে বা সাধারণ ফিল্টারে ছেঁকেও এই পানি নিরাপদ করা যায় না। বিকল্প হিসেবে পরিষ্কার ছাদ থেকে বৃষ্টির প্রথম দিকের পানি বাদ দিয়ে পরবর্তী পানি ঢাকনাযুক্ত পাত্রে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এছাড়া পুকুরে সংরক্ষিত পানি পান করার আগে ফুটিয়ে বা ফিটকিরি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরীক্ষায় নিরাপদ প্রমাণিত নলকূপের পানি অথবা আর্সেনিক অপসারণে সক্ষম পরীক্ষিত ফিল্টারের পানি পান করা যেতে পারে।
তিন দশক ধরে আর্সেনিকের সঙ্গে বসবাস
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে প্রথম কৃষ্ণকাটি আটঘরা গ্রামের নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। তখন থেকেই পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে পানির নমুনা পরীক্ষায় গ্রামের ৯২ শতাংশের বেশি নলকূপের পানি আর্সেনিক দূষিত পাওয়া যায় বলে দাবি স্থানীয়দের।
ওই পরীক্ষার পর দূষিত নলকূপের পানি পান ও ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিকল্প হিসেবে পুকুরের পানি এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নিরাপদ পানির পর্যাপ্ত উৎস না থাকা, সচেতনতার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পানি ব্যবহার অব্যাহত রাখেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আর্সেনিক একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। দূষিত পানি দীর্ঘদিন পান করার ফলে শরীরে এর ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক বছর লেগে যায়। ফলে একজন মানুষ যখন বুঝতে পারেন তার শরীরে আর্সেনিকের প্রভাব পড়েছে, ততদিনে শারীরিক জটিলতা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।
কৃষ্ণকাটি আটঘরার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে সেই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির চিত্রই উঠে এসেছে তাদের অভিজ্ঞতায়। অনেকের দাবি, বছরের পর বছর দূষিত পানি ব্যবহারের পর শরীরে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। একদিকে পুরোনো আক্রান্তদের চিকিৎসা চলছে, অন্যদিকে নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বিগ্ন তারা।
সামাজিকভাবে একঘরে হওয়ার অভিযোগ
শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি কৃষ্ণকাটি আটঘরার মানুষের জীবনে আরেকটি সংকট তৈরি হয়েছে। তা হলো সামাজিক বৈষম্য।আর্সেনিকজনিত চর্মরোগ ছোঁয়াচে নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশা, একই জায়গায় বসা কিংবা স্বাভাবিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় না। কিন্তু এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে আশপাশের এলাকার কিছু মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীর।
স্থানীয়রা জানান, কৃষ্ণকাটি আটঘরা আর্সেনিক আক্রান্ত গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠায় অন্য এলাকার অনেক পরিবার এখানে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিতে আগ্রহ দেখায় না। আবার গ্রামের মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় অভিভাবকদের।
কোনো ব্যক্তির হাতে-পায়ে আর্সেনিকজনিত চর্মরোগের দৃশ্যমান লক্ষণ থাকলে সামাজিক অনুষ্ঠানে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন আক্রান্তরা। হাট-বাজারেও তাদের অনেককে ভিন্ন চোখে দেখা হয়। রোগের চিকিৎসা করানোর পাশাপাশি তাই নিজেদের সামাজিক পরিচয় নিয়েও সংকটে পড়তে হচ্ছে গ্রামের মানুষকে।
দুবেলা ভাতই জোটে না, ওষুধ কেনার টাকা কোথায় পাবেন বৃদ্ধ দম্পতি
একটি গ্রামের পানিদূষণ কীভাবে ধীরে ধীরে সামাজিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, কৃষ্ণকাটি আটঘরার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা সেই চিত্রই তুলে ধরছে। এখানে রোগের কারণে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, বিয়ে ও সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ রয়েছে।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে হাজার ট্যাংক, তবুও কাটেনি সংকট
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু জানান, শুধু কৃষ্ণকাটি আটঘরা নয়, ইউনিয়নের আরও কয়েকটি গ্রামের নলকূপের পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য প্রায় এক হাজার পানির ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে। তবে ট্যাংক বিতরণের পরও কৃষ্ণকাটি আটঘরার নিরাপদ পানির সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি।
স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস এই গ্রামে। এত মানুষের পানির চাহিদা মেটাতে বর্তমানে একটি গভীর নলকূপই প্রধান ভরসা।
বছরের পর বছর ধরে আর্সেনিকের সমস্যায় ভোগা বাসিন্দাদের কাছে নিরাপদ পানির একটি স্থায়ী ব্যবস্থা এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, পানির সংকট দীর্ঘায়িত হলে নতুন করে আরও মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
আক্রান্তদের জন্য নেই বিশেষ চিকিৎসা কর্মসূচি
আর্সেনিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই গ্রামের অসুস্থ মানুষের জন্য আলাদা কোনো সরকারি চিকিৎসা কর্মসূচি না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করার ফলে ত্বকের বিভিন্ন পরিবর্তনসহ জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। আর্সেনিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। আর্সেনিকোসিসের নির্দিষ্ট কোনো নিরাময়মূলক চিকিৎসা না থাকলেও আক্রান্তদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে সমস্যা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তার মতে, চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্সেনিকযুক্ত পানি পান বন্ধ করা। দূষিত পানির সংস্পর্শ অব্যাহত থাকলে চিকিৎসার মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়।
অন্যদিকে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জানান, জেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীদের জন্য বর্তমানে বিশেষ কোনো চিকিৎসা কর্মসূচি চালু নেই। সরকারিভাবে তাদের জন্য আলাদা ওষুধ কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই।
তিনি জানান, কোনো এলাকায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা তাদের তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান।
কিন্তু বছরের পর বছর ধরে আক্রান্ত কৃষ্ণকাটি আটঘরার মানুষের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও রোগ পর্যবেক্ষণের কোনো বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, নিরাপদ পানির পাশাপাশি অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে সংকটের সমাধান হবে না।
বিকল্প উৎস খুঁজছে জনস্বাস্থ্য বিভাগ
আর্সেনিকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর গ্রামের নিরাপদ পানির সমস্যা সমাধানে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আর্সেনিকমুক্ত পানির ব্যবস্থা করতে এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা থাকায় সেখান থেকেও প্রত্যাশিতভাবে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতিতে গ্রামের বাইরে অন্য কোনো নিরাপদ উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে কৃষ্ণকাটি আটঘরায় সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ জানান, এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও লবণাক্ততার সমস্যা থাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহে বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্য এলাকা থেকে সুপেয় পানি এনে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রামে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
তবে এই ব্যবস্থা কবে নাগাদ চালু হবে, তা নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে অপেক্ষা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলা করা বাসিন্দারা চান, পরিকল্পনা যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আরও জানান, আর্সেনিকযুক্ত পানি উচ্চ তাপমাত্রায় ফুটিয়ে আর্সেনিকমুক্ত করা যায় না। পানি ফুটালে জীবাণু নষ্ট হলেও আর্সেনিক থেকে যায়, বরং পানি বাষ্পীভূত হলে আর্সেনিকের ঘনত্ব বাড়তে পারে। তাই আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকার মানুষ বিকল্প হিসেবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারেন। এজন্য বাড়ির চাল বা পরিষ্কার ছাদ থেকে বৃষ্টির প্রথম দিকের পানি বাদ দিয়ে পরবর্তী পানি পরিষ্কার ও ঢাকনাযুক্ত ট্যাংকে রাখতে হবে। পান করার আগে সংরক্ষিত পানি ফুটিয়ে বা উপযুক্ত পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এছাড়া পরীক্ষিত নিরাপদ গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।
আধুনিক আরও (রিভার্স অসমোসিস) মেশিনের সাহায্যে পানিকে সম্পূর্ণ আর্সেনিক মুক্ত করা সম্ভব, তবে সেটি অনেক ব্যায়বহুল। রিভার্স অসমোসিস হলো পানি বিশুদ্ধকরণের অন্যতম একটি কার্যকর আধুনিক প্রযুক্তি, যা পানির ক্ষতিকারক দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ (টিডিএস) এবং ভারী ধাতু দূর করতে পারে। তবে সাধারণ ফিল্টার, ফিটকিরি বা পানি ফুটিয়ে আর্সেনিক কিংবা লবণাক্ততা দূর করা যায় না।
জাহিদ পারভেজ বলেন, পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে পানি পরীক্ষা করানো জরুরি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে পানির নমুনা নিয়ে এলে সেটি ল্যাবে পরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আর্সেনিক দূষণের সম্পর্ক কী?
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আর্সেনিক দূষণের সম্পর্ক বিষয়ে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গাউছার রেজা বলেন, ‘সাতক্ষীরা গঙ্গা বদ্বীপের অংশ হওয়ায় হাজার হাজার বছর ধরে নদীবাহিত পলি, বালু ও কাদামাটি জমে এখানকার ভূস্তর গঠিত হয়েছে। প্রাচীন সামুদ্রিক প্রভাবের কারণে ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তরে লবণাক্ত পানি আটকে রয়েছে। আবার কোথাও অগভীর স্তরে মিঠাপানি পাওয়া গেলেও ভূগর্ভস্থ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কারণে তাতে অতিরিক্ত আয়রন ও আর্সেনিক থাকতে পারে। গভীর নলকূপের পানিও অনেক এলাকায় প্রাচীন লবণাক্ত পানির উপস্থিতি ও বিভিন্ন স্তরের পানির মিশ্রণের কারণে লবণাক্ত হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতা ভূগর্ভস্থ পানির রাসায়নিক পরিবেশ বদলে আর্সেনিকের ঝুঁকি কিছু এলাকায় আরও বাড়াতে পারে। পাশাপাশি নিরাপদ মিঠাপানির সংকটে মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাই শুধু গভীর নলকূপ স্থাপন নয়, ভূতাত্ত্বিক গঠন ও পানির গুণগত মান যাচাই করে টেকসই সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’








































