Home খেলাধুলা রোনালদোর পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত পর্তুগাল

রোনালদোর পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত পর্তুগাল

0

স্পোর্টস ডেস্ক।।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! একই সময়ের দুই ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিদায় দুই রকম হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির বিদায়টা হতে যাচ্ছে একজন নায়কের মতো।

আর্জেন্টিনার হয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে মঙ্গলবার (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টায়) বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামার অপেক্ষায় ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।

অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে একেবারেই ভিন্ন এক পরিণতিতে, সতীর্থদের সঙ্গে দর্শকদের অভিবাদন গ্রহণের বদলে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগেই টানেলে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

বিশ্বকাপের পর মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। রোনালদো অবশ্য ৪১ বছর বয়সেও পর্তুগালের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তবে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি কয়েক দিন দীর্ঘ হচ্ছে। মঙ্গলবার ঘরের মাঠে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচটিই হতে পারে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ।

রোনালদোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখন বেশ জটিল। নেশন্স লিগে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে দীর্ঘ সময় ওয়ার্মআপ করিয়েও মাঠে নামানো হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থদের সঙ্গে সমর্থকদের কাছে না গিয়ে সরাসরি টানেলে চলে যান তিনি। এরপর জানতে পারেন, পরের ম্যাচে ডেনমার্কের বিপক্ষেও তিনি একাদশে থাকবেন না। এর পরই পর্তুগালের ক্যাম্প ছেড়ে যান আল নাসরের এই ফরোয়ার্ড।

পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো। দুটিই আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিশ্ব রেকর্ড। তবে নতুন কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে প্রকাশ্য টানাপোড়েনের পর এখন তাকে বড় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

জেসুস অবশ্য জানিয়েছেন, রোনালদো চাইলে জাতীয় দলে ফিরতে পারবেন। পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনও রোনালদো ও তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। তবে শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলে তার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রোনালদোকেই।

জেসুসের অধীনে আল নাসরেও গত মৌসুমে কাজ করেছেন রোনালদো। পর্তুগালের নতুন কোচ হওয়ার পরও রোনালদোকে নিয়ে শুরুতে সমস্যা ছিল না। ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমাদের প্রেসিডেন্ট ও কোচের সঙ্গে কথা বলেছি। এখনো বিশ্বাস করি, জাতীয় দলকে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমি সাহায্য করতে পারি।’

এর পরও পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ওয়েলসের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে শুরু থেকেই খেলেছিলেন রোনালদো। পরের ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে তাকে বেঞ্চে রাখা হয়। ম্যাচের একটি পর্যায়ে দীর্ঘ সময় ওয়ার্মআপ করানো হলেও শেষ পর্যন্ত মাঠে নামানো হয়নি। ১৮ বছর পর প্রথমবার পর্তুগালের কোনো ম্যাচে অব্যবহৃত বদলি হিসেবে থাকতে হয় তাকে।

রোনালদোকে নিয়ে বই লেখা সাংবাদিক গিলেম বালাগে বলেন, পুরো দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় সময়ই তাকে ওয়ার্মআপ করানো হয়েছিল। তার মতে, পেলে, দিয়েগো মারাদোনা, মেসি কিংবা রোনালদোর মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে এভাবে আচরণ করার অলিখিত একটি নিয়ম রয়েছে ফুটবলে।

ঘটনার পর জেসুস বলেছিলেন, তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ হয়নি। তবে ডেনমার্কের বিপক্ষেও রোনালদো শুরু করবেন না বলে নিশ্চিত করেন তিনি। এরপরই জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়েন রোনালদো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘যথাসময়ে আমি পর্তুগালের মানুষকে জাতীয় দল ছাড়ার কারণ সম্পর্কে সত্যটা জানাব।’

পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসা বিষয়টি মেটাতে ভোররাতে কোপেনহেগেনে পৌঁছালেও রোনালদোর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে পারেননি। পরে তিনি বলেন, রোনালদো তার খেলার যোগ্যতার ভিত্তিতেই জাতীয় দলে আছেন এবং তাকে সম্মান জানানো উচিত।

নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পরও রোনালদোকে ছাড়া ম্যাচ শেষে জেসুস বলেন, ‘সে (রোনালদো) চাইলে জাতীয় দলে ফিরবে। পরের দল ঘোষণার আগে আমরা কথা বলতে পারি। তবে সিদ্ধান্ত নেবে সে-ই। জাতীয় দলের হয়ে তার সময়টা কীভাবে শেষ করতে চায়, সেটিও তারই সিদ্ধান্ত।’

রোনালদোর সমর্থনে এরই মধ্যে পর্তুগালের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টারও দেখা গেছে। লিসবনের কয়েকটি বিলবোর্ডে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে জেসুসের সমালোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচে কিছু সমর্থক রোনালদোর নামসংবলিত পোশাক পরে মাঠে এসেছিলেন। আবার কেউ কেউ জেসুসের সমর্থনে টি-শার্ট পরেছিলেন।

রোনালদোর পক্ষে-বিপক্ষে মতামতও বিভক্ত। পর্তুগালের সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামেও ভিন্নতা দেখা গেছে। কেউ লিখেছে ‘জেসুসের সঙ্গে সংঘাতের পর রোনালদোর বিদায়’, কেউ বলেছে ‘এক ঐতিহাসিক যুগের শেষ’। অন্যদিকে কেউ এটিকে বলেছে ‘বিষণ্ণ বিদায়’ কিংবা ‘জাতীয় দলের দিকে পিঠ ফেরালেন সিআর৭’।

পর্তুগালের লিসবনের সমর্থক মারিয়া রিবেইরো মনে করেন, রোনালদোকে ভালোবাসলেও পরিস্থিতি এখন কঠিন হয়ে গেছে। তার ভাষায়, ‘পর্তুগালকে রোনালদো ছাড়া ভাবা কঠিন। তবে হয়তো এটাই সময়। নিজেদের মধ্যে এত বেশি তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে।’

রোনালদোর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি তার ১০০০ গোলের লক্ষ্যও আলোচনায় রয়েছে। পর্তুগাল, স্পোর্টিং, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস ও আল নাসরের হয়ে এখন পর্যন্ত ৯৭৯ গোল করেছেন তিনি। অর্থাৎ ১০০০ গোলের মাইলফলক থেকে আর ২১ গোল দূরে।

তবে জাতীয় দলে আর খেলতে না পারলে সেই মাইলফলকে পৌঁছানোর বাকি পথটা সৌদি আরবের ক্লাব ফুটবলে পাড়ি দিতে হতে পারে তাকে।

এদিকে গত বিশ্বকাপে মেসি আট গোল করার পাশাপাশি চারটি গোলে সহায়তা করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। বিপরীতে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয় পর্তুগাল। রোনালদো তিনটি গোল করলেও স্পেনের বিপক্ষে হারের ম্যাচে তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিবিসির বিশ্লেষক ক্রিস সাটন তার পারফরম্যান্সের সমালোচনা করে বলেন, তিনি মাঠে ‘দাদুর মতো হাঁটছিলেন’।

রোনালদোর সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সতীর্থ ওয়েইন রুনিও বলেন, ‘সে একজন জিনিয়াস, একজন সুপারস্টার। ফুটবল ও কোটি মানুষের জন্য সে যা দিয়েছে, তা খুবই বিরল।’ তবে বয়সের বাস্তবতাও মেনে নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করেন রুনি।

পর্তুগালের গত নয় বছরে রোনালদো ছাড়া দলের জয়ের হার ৬৬ শতাংশ, আর তাকে নিয়ে ৬৩ শতাংশ। রোনালদো ছাড়া ম্যাচে পর্তুগাল গড়ে ২.৭ গোল করেছে, যেখানে তাকে নিয়ে গড় ২.১ গোল।

আরও একটি পরিসংখ্যান আলোচনায় এসেছে। পর্তুগালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুটি জয়, লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে ৯-০ এবং আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ৯-১, এসেছে রোনালদো না খেলা সর্বশেষ দুটি বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচে। দুই ম্যাচেই নিষেধাজ্ঞার কারণে ছিলেন না তিনি।

পর্তুগালকে নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক মার্কোস আলভেসের মতে, রোনালদোর প্রতি কৃতজ্ঞতার সীমা নিয়েও এখন দেশটির সমর্থকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার দাবি, পর্তুগালের সর্বশেষ পাঁচ কোচের মধ্যে চারজনের সঙ্গেই রোনালদোর কোনো না কোনো সমস্যা হয়েছে। কার্লোস কুইরোজ, পাওলো বেন্তো, ফার্নান্দো সান্তোসের পর এবার জর্জ জেসুসের সঙ্গেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

তার মতে, পর্তুগালের সম্ভাব্য সেরা প্রজন্মের সময়ে রোনালদোকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি দলের জন্য বাড়তি বিভ্রান্তি তৈরি করছে।