Home আঞ্চলিক ক্ষমতাধর জুট মিলের তাণ্ডব: জমি জবরদখল ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, বিচারের আশায় দ্বারে...

ক্ষমতাধর জুট মিলের তাণ্ডব: জমি জবরদখল ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বকুল বেগম

22


স্টাফ রিপোর্টার।।


ক্রয়কৃত জমিতে সুখে-শান্তিতে বসবাসের স্বপ্ন দেখেছিলেন খুলনার লবনচরা এলাকার বাসিন্দা বকুল বেগম। কিন্তু একটি প্রভাবশালী পাটকলের নজর পড়তেই বদলে যায় সেই চিত্র। জমি দখল, জালিয়াতির মাধ্যমে মিউটেশন (নামপত্তন) তৈরি এবং দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বসতবাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে এক পরিবারকে দুর্বিষহ জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নগরীর সলুয়া ও লবনচরা এলাকার ‘ওহাব জুট মিল’ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসন ও ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের মদদে এমন তাণ্ডব চালানো হলেও আজও কোনো প্রতিকার পাননি ভুক্তভোগী। সুবিচারের আশায় এখন কড়া নাড়ছেন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে-দুদক, জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে খুলনা প্রেসক্লাব পর্যন্ত।


ক্রয়কৃত জমিতে থাবা ও রাজনৈতিক নির্যাতন: অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৩ সালে আসমত আরা খানম নামে এক নারীর কাছ থেকে ২০৮ ও ১০৫১৮ নং দাগে মোট ০.০৬৯৩ একর (অন্য সূত্রে ০.০৬৬০ একর) জমি ক্রয় করেন বকুল বেগম। নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে সেটিতে বসবাসও শুরু করেন তিনি। তবে ২০০৫ সালে পাশেই ওহাব জুট মিল স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় জবরদখলের চক্রান্ত।


অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন খুলনা-২ আসনের সাবেক এমপিসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও ক্যাডারদের ব্যবহার করে বকুল বেগমের ওপর অন্যায্য চাপ দেওয়া হতে থাকে। জমি হাতাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ভূমি অফিসের (এসিল্যান্ড) অসাধু কর্মকর্তা ও কানুনগোদের প্রভাবিত করে বকুল বেগমের অজান্তেই জুট মিলের নামে জালিয়াতি মিউটেশন বানিয়ে নেয় মিল কর্তৃপক্ষ।


বিদ্যুৎহীন অন্ধকার জীবন ও জালিয়াতির চক্র: ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ২০১৮ সালের দিকে বকুল বেগমের বসতবাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে চরম গরমে ও অন্ধকারে অমানসিক ও দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে পরিবারটি।


ঘটনার সুরাহা পেতে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করলে তিনি ২০১৮ সালের ৪ মার্চ ১৫০ ধারায় পূর্বের অবৈধ নামপত্তন পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে এসিল্যান্ড কার্যালয় তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ পায়। তৎকালীন এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম ও কানুনগো জাকির টাকার বিনিময়ে একটি কাগজ প্রদান করলেও পরে প্রকাশ পায়-সেটিও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে।


আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্ব্যবহারের শিকার: বকুল বেগম অভিযোগ করেন, সুবিচার চাইতে সাবেক জেলা প্রশাসক হেলাল উদ্দিন, মনির তালুকদার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেন, ফিরোজ শাহ ও আরডিসি আলামিনসহ একাধিক কর্মকর্তার দপ্তরে গেলে উল্টো তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এমনকি ওজোপাডিকোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী চিন্ময় সাহা, সহকারী প্রকৌশলী মো. খালিকুল্লাহ খান ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হক বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনে বারবার নানা বাহানা ও সমস্যা তৈরি করছেন।


দুদক ও সংবাদ সম্মেলনে আকুতি: আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক আবেদন করার পর সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) খুলনার গণশুনানিতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে সব তথ্য-প্রমাণ পেশ করেন বকুল বেগম। পরবর্তীতে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল এবং খুলনা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন তিনি।


সংবাদ সম্মেলনে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বকুল বেগম বলেন, “ওহাব জুট মিল ও ভূমি অফিসের অসাধু চক্র আমাদের জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে। বিচার চাইতে গেলে উল্টো গুন্ডা পাঠিয়ে আমাদের ছবি তুলে রাখে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। আমরা এখন চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।”


জমি উদ্ধার, জাল মিউটেশন বাতিল, দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান এবং জুট মিলের মালিকসহ জড়িত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এখন প্রশাসনের উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এই ভুক্তভোগী নারী।