স্টাফ রিপোর্টার।।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শান্ত ও বাণিজ্যিক নগরী খুলনার রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার এক গভীর ও নতুন চক্রান্তের অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতার প্রস্তুতি, গোপন বৈঠক এবং দেশবিরোধী নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সাম্প্রতিক সময়ে নগরী ও উপজেলায় একাধিক মামলাসহ বেশ কয়েকজন গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ডুমুরিয়ায় গোপন বৈঠকের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ৪৭ জনের তালিকায় উঠে এসেছে স্থানীয় এক সাংবাদিকের নামও।
এমন প্রেক্ষাপটে খুলনার রাজনৈতিক সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের মনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের এই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে পেশাজীবী মহলের কেউ কেউ কি আড়ালে থেকে মদদ দিচ্ছেন? বিশেষ করে অতীতে ক্ষমতার সুবাদে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে চরম ঘনিষ্ঠ থাকা কতিপয় সাংবাদিক ও আইনজীবীর রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে শহরজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ ও কোনঠাসা সংগঠনের নেতাকর্মীরা এখন আর প্রকাশ্যে মাঠে নামতে পারছে না। ফলে তারা নিজেদের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত গোপন যোগাযোগ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী নেটওয়ার্কের আড়ালকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে পুলিশের ভাষ্য-কারো বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কিংবা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমান মিললেই কেবল তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে, কোনো পেশাগত ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
খুলনায় গত জুলাই ও চলতি সেপ্টেম্বরজুড়ে নিষিদ্ধ সংগঠনটির বিরুদ্ধে একাধিক শক্ত আইনি পদক্ষেপ দেখা গেছে। সম্প্রতি জুলাই মাসে খুলনা সদর থানায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র ও জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগে মামলা হয়।
এরপর সেপ্টেম্বরেও সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ নগরীতে ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার প্রস্তুতির অভিযোগে কয়েকজনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। পুলিশের অভিযানে তাদের হেফাজত থেকে নাশকতামূলক মিছিলের ব্যানার ও গুরুত্বপূর্ণ মেসেজসহ মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে, ডুমুরিয়ায় একটি গোপন বাগানবাড়িতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অচল করা, ঝটিকা মিছিল ও সরকার উৎখাতের পরিকল্পনায় গোপন বৈঠককালে পুলিশের অভিযানে মামলা হয়, যেখানে শিক্ষক-সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা আসামি হয়েছেন।
প্রশাসন আরও আশঙ্কা করছে, মাঠে টিকতে না পেরে চক্রটি সাইবার স্পেসকে অপব্যবহারের চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, সম্পাদিত ভিডিও কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভয়েস ক্লোনিং বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে নতুন করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে চক্রটি।
নগরীর শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য যেকোনো নাশকতা নস্যাৎ করতে প্রস্তুত রয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) ও জেলা পুলিশ। “খুলনা নগরীর শান্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করতে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন বা তাদের কোনো দোসরকে নগরীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। যারা গোপন আস্তানায় বসে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নাশকতা চালানোর চেষ্টা করছে, তাদের তালিকা আমাদের হাতে রয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোয়েন্দা শাখা) বলেন, “পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে থেকে কেউ যদি নিষিদ্ধ সংগঠনের নাশকতায় অর্থায়ন, গোপন বৈঠক কিংবা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে, তবে তাকেও অপরাধের সমান অংশীদার হিসেবে বিচার করা হবে। সাংবাদিক বা আইনজীবী-যেকোনো পেশার আড়ালেই অপরাধ লুকানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আমরা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি। পুরো খুলনায় গোয়েন্দা নজরদারি শতভাগ বাড়ানো হয়েছে।”
ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, “বাগানবাড়িতে গোপন বৈঠকের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে যেমন খেয়াল রাখা হচ্ছে, তেমনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।”
সাংবাদিকতা ও আইন পেশা সমাজের অন্যতম আস্থার জায়গা। কিন্তু পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বা নাশকতায় লিপ্ত হয়, তবে পুলিশ প্রশাসন তা কোনোভাবেই বরদাশত করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে খুলনার স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।











































