খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাবা, চারপাশে মানুষের ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে বাবার কাছে ছুটে যায় ছোট্ট মেয়েটি। হাতে চা ও রুটি। কাছে গিয়েই বাবার মুখে খাবার তুলে দিতে শুরু করে সে। সারারাত না খেয়ে থাকা বাবাকে নিজের হাতে খাওয়ানোর সেই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সেখানে থাকা অনেকে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের এই দৃশ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বাবার কর্মসংস্থান ও মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা শুরু হয়। কেউ বাবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান, কেউ আবার মেয়েটির পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনে পাশে থাকার কথা বলেন।
এরই মধ্যে রোববার সেই বাবা রায়হানুল হক অনিকের বাড়িতে যান উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা ও উজিরপুর থানার কর্মকর্তারা। তারা অনিকের সঙ্গে কথা বলেন। ইউএনও জানান, অনিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তার মেয়ের পড়াশোনার খরচ ব্যক্তিগতভাবে বহনের কথাও জানান তিনি। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বাবা-মেয়ের ওই দৃশ্য ঘিরে এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন অনিকের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগের দিন শুক্রবার রাত ১২টার দিকে বামরাইল বাজারের একটি মুদিদোকানে চুরি করতে গিয়ে অনিক সরদার আটক হন বলে জানায় স্থানীয়রা। পরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী তাকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন বলে অভিযোগ ওঠে। শনিবার সকালে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায় তার বড় মেয়ে তুবা বিনতে অন্নি। সে বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।
তবে চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে রায়হানুল হক অনিক বলেন, পারিবারিক অবস্থা আমাদের একসময় ভালো ছিল। কিন্তু আমার বাবা ওয়ারেজ সরদার হাইকোর্টে চাকরি করতেন। অবসরে যাওয়ার পর থেকে একদম পরিবারের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। আর অবসরে যাওয়ার পর যে টাকা বাবা পায়, সেটা তার পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। এখন যে টাকা পেনশন পায়, সেটাও তার ওষুধের পেছনে শেষ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, আমার আপন ভাই সৌদি আরবে থাকে, আর বোনের বিয়ে হয়েছে। তারা দুজনই আমার পাশে নেই। সবাই আমার থেকে দূরত্ব রেখে চলে। এ কারণে আজ আমার এমন পরিস্থিতি। আমারও দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার ভাই আমাকে নেয়নি। ২০১৪ সালে বিদেশে যাওয়ার জন্য সাড়ে ৪ লাখ টাকা লোকসান গুনি। এরপর স্যানিটারি কাজ করে সংসার চালাই। কিন্তু কাজ কোনোদিন থাকত, আবার কোনোদিন থাকত না।
অনিক বলেন, চুরির উদ্দেশ্যে নয়, আমি পরিচিত এক ভাই, যিনি সম্প্রতি জেল খেটে ফিরেছেন, তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। এসময় পরিচিত সেই ভাইয়ের বাড়ির সামনে আমার সঙ্গে এ ঘটনা ঘটে। জোরজবরদস্তি করে আমার ওপর চুরির অপবাদ চাপানো হয়েছে। পুরো ঘটনাটি জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের নাম বলেননি অনিক। পাশাপাশি তিনি মাদকের সঙ্গে জড়িত কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
তিনি আরও বলেন, বামরাইল বাজার আমার বাড়ির পাশেই। খবর পেয়ে আমার মেয়ে বামরাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা বিনতে অন্নি বাজারে ছুটে যায়। পরে সেখানে গিয়ে কান্নাকাটি। আমাকে চা আর রুটি খাওয়ায়। এরপর আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। আমার ২ মেয়ের মধ্যে তুবা বড়। এছাড়া ৩ বছরের তুরিন নামে আরেকটি মেয়ে আছে। আর আমার স্ত্রী গৃহবধূ। ঘটনার পর আজ (রোববার) বাড়িতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসেছিলেন। তারা আমাকে কর্মসংস্থান করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি আমার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটানো হয়েছে, সেটার খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া আমার মেয়ে তুবা বিনতে অন্নির লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও জানান। আমার চিন্তা আপাতত একটা অটো পেলে সেটি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম।
এ বিষয়ে উজিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, অনিক মূলত মাদকাসক্ত। নেশার টাকার জন্য সে ছোটখাটো চুরি করে এবং এ পর্যন্ত ১৫-১৬ বার ধরা খেয়েছে। শুক্রবারও চুরির উদ্দেশ্যে দোকানে ঢ়ুকলে এলাকাবাসী তাকে আটক করে, তবে তার মেয়ের করুণ অবস্থা দেখে মুচলেকা রেখে ছেড়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, জায়গা-জমি নিয়ে অনিকের বক্তব্য অসত্য। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো। বাবা চাকরিজীবী ছিলেন, ভাই প্রবাসে থাকেন। ঘটনার আগের রাতে গত বৃহস্পতিবার বোন অনিকের ৩৫ হাজার টাকার বাকি শোধ করেছেন। সে মাদক ছেড়ে ভালো পথে ফিরলে অনেকে তাকে ভ্যানগাড়িসহ সহায়তার কথা জানিয়েছে। পুলিশও আইনগতভাবে পাশে থাকবে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, অনিকদের পারিবারিক অবস্থা ভালো হলেও সঙ্গদোষে সে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সে অসুস্থ, তার দ্রুত রিহ্যাবে চিকিৎসা প্রয়োজন। এ নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। অনিককে একটি অটোভ্যান দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং সে না পারলে তার স্ত্রীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া তার মেয়ের পড়াশোনার পুরো খরচ আমি ব্যক্তিগতভাবে বহন করবো।











































