Home আঞ্চলিক সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রায় পর্যটন ঘিরে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা

সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রায় পর্যটন ঘিরে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা

2

কয়রা প্রতিনিধি।।


সুন্দরবন ঘেঁষা খুলনার কয়রা উপজেলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, এই জনপদে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে তা ঘিরে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কমে আসবে অঞ্চলভিত্তিক বেকারত্বের হার, সরকার পাবে রাজস্ব।

নদী, বন, জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে কয়রায়। জেলা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত উপজেলাটি সুন্দরবনসংলগ্ন। উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী। নদীর ওপারে চোখে পড়ে সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। কেওড়া, গেওয়া, বাইন, সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছপালা, নদী-খাল, পাখি ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে করেছে বৈচিত্র্যময়।


কয়রা সদর উপজেলার ছয় নম্বর কয়রা গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর তীরে কেওড়াকাটা নামক স্থানে নির্মাণাধীন রয়েছে ‘সুন্দরবন’ পর্যটন কেন্দ্র। সুন্দরবনের একেবারে কাছাকাছি হওয়ায় সম্ভাবনাময় এই স্থানটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। এখানে রয়েছে মুন্ডা সম্প্রদায়ের বসবাস। কাছ থেকে পর্যটকরা দেখতে পারবেন তাদের জীবনযাপন।

স্থানীয়রা বলছেন, কয়রার পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হতে পারে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। উত্তর বেদকাশীতে রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা, আমাদীতে বোরহান খাঁ ওরফে বুড়া খাঁ ও তার ছেলে ফতে খাঁর স্মৃতিচিহ্ন, পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বোরহান খাঁ ওরফে বুড়া খাঁ ও তার ছেলে ফতে খাঁ আমাদী এলাকায় আসেন। তারা সেখানে মসজিদকুঁড় মসজিদ নির্মাণ করেন।

বর্তমানে আমাদী ভূমি অফিসের দক্ষিণ পাশে তাদের বসতভিটার নিদর্শন আছে। সেখানে রয়েছে চাল ধোয়ার দীঘি, ডাল ধোয়ার দীঘি, হাতি বান্ধার দীঘি এবং আমাদীর দীঘি ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে।


খুলনা থেকে সড়কপথ সহজেই কয়রায় পৌঁছানো যায়। খুলনার সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বাসে কয়রা সদরে আসতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। এরপর মদিনাবাদ মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মোড় থেকে ইজিবাইক বা মোটরসাইকেলে মাত্র কয়েক মিনিটেই পৌঁছানো যায় ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট ও ৬ নম্বর কয়রা এলাকার পর্যটনকেন্দ্রসংলগ্ন স্থানে।

খুলনা নতুন বাজার লঞ্চঘাট থেকেও নদীপথে কয়রায় আসার সুযোগ রয়েছে। লঞ্চযাত্রায় সময় বেশি লাগলেও নদী ও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ভ্রমণের আলাদা আনন্দ পাওয়া যায়।

কয়রা সদরে পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে কয়েকটি আবাসিক হোটেল। ফলে পর্যটকরা স্বল্প খরচে অবস্থান করে একাধিক পর্যটন স্পট ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন।

কয়রায় পৌঁছে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও পাস নিয়ে ট্রলারে সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে যাওয়া সম্ভব। শেখেরটেক ও কালাবগী ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর ও শুঁটকি পল্লীসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সুন্দরবনের শেখেরটেক ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রের পুরোনো স্থাপনাগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম উপাদান। বন, নদী, বন্যপ্রাণী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়রায় পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। নৌযান চালক, ট্যুর গাইড, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, হোমস্টে, পরিবহন, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্পসহ নানা খাতে মানুষের আয় বাড়তে পারে।


বিশেষ করে সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ বনজীবীদের জন্য পর্যটন হতে পারে বিকল্প আয়ের বড় উৎস। এতে একদিকে যেমন তাদের জীবন-জীবিকার বৈচিত্র্য বাড়বে, অন্যদিকে সুন্দরবনের ওপর চাপও কমতে পারে।

কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আ.ব.ম. আব্দুল মালেক বলেন, সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলোতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে কয়রা হয়ে উঠতে পারে ইকো-ট্যুরিজমের স্বর্গভূমি। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

২০১৮ সাল থেকে কয়রার এই সম্ভাবনাময় এলাকায় আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে উপকূলের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আশিকুজ্জামান বলেন, সুন্দরবনবেষ্টিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা কয়রায় পরিকল্পিতভাবে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে। কেওড়াকাটায় নির্মাণাধীন পর্যটনকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শেষ করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।