মিলি রহমান।।
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া মানেই যে ওজন দ্রুত কমবে, এমন নয়। ঘরে তৈরি খাবার, পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি খাওয়ার পাশাপাশি ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চললেও কারও কারও ওজন ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। এর পেছনে খাবারের পরিমাণ থেকে শুরু করে ঘুম, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম, হরমোন ও কিছু শারীরিক সমস্যার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
১. স্বাস্থ্যকর খাবারও বেশি পরিমাণে খাওয়া হতে পারে
পুষ্টিকর খাবার হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। বাদাম, বীজ, পিনাট বাটার, অ্যাভোকাডো, গোটা শস্য, পনির ও রান্নার তেলের মতো খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকলেও এগুলো তুলনামূলক ক্যালোরিসমৃদ্ধ। যেমন, সালাদে বেশি বাদাম বা ড্রেসিং যোগ করলে অজান্তেই ক্যালোরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই খাবারের গুণগত মানের পাশাপাশি পরিমাণের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ধীরে খাওয়া এবং শরীরের ক্ষুধা ও পেট ভরে যাওয়ার সংকেত বোঝার চেষ্টা করলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব।
২. স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকসও অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারে
গ্রানোলা, প্রোটিন বার, স্মুদি, শুকনো ফল কিংবা দই স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় থাকতে পারে। কিন্তু ঘন ঘন এসব খেলে দিনের মোট ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই প্রতিবার খাবার বা স্ন্যাকস নেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা ভালো—সত্যিই কি ক্ষুধা পেয়েছে, নাকি একঘেয়েমি, মানসিক চাপ কিংবা হাতের কাছে খাবার থাকার কারণেই খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে?
৩. দৈনন্দিন চলাফেরা কমে যেতে পারে
ওজন নিয়ন্ত্রণে শুধু খাবারের ভূমিকা নেই, শারীরিক কার্যকলাপও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম করলেও দিনের বাকি সময় যদি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়, বাড়ি থেকে কাজ করতে হয়, গাড়িতে বেশি সময় কাটে কিংবা অবসর সময়ে বেশিরভাগ সময় সোফায় বসে থাকেন, তাহলে দৈনিক ক্যালোরি খরচ কমে যেতে পারে।
বেশি হাঁটা, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার, ঘরের কাজ করা কিংবা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার মাঝে নিয়মিত বিরতি নেওয়ার মতো ছোট পরিবর্তনও দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
৪. ঘুমের ঘাটতিও প্রভাব ফেলতে পারে
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ওজন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ঘুমের অভাব ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া কিংবা বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ঘুম কম হলে দিনের বেলায় ক্লান্তি বাড়ে এবং শারীরিক কার্যকলাপের পরিমাণও কমে যেতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার ও ব্যায়ামের পাশাপাশি নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
৫. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রভাব
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কেউ কেউ চাপের মধ্যে বেশি খাবার খান, বিশেষ করে চিনি, চর্বি বা ক্যালোরি বেশি থাকা খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। স্ট্রেসের কারণে ঘুমের সমস্যা ও শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
তবে শুধু কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়াকেই ওজন বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। খাবারের ধরন, ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম ও সামগ্রিক ক্যালোরির ভারসাম্যও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, পছন্দের কাজে সময় দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ ও রিল্যাক্সেশন কৌশল মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
৬. হরমোন বা কিছু শারীরিক সমস্যাও কারণ হতে পারে
সবসময় ওজন বাড়ার কারণ অতিরিক্ত খাওয়া নয়। কিছু শারীরিক সমস্যা ও হরমোনজনিত পরিবর্তন ওজন নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে। যেমন, থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে গেলে ক্লান্তি, ঠান্ডা বেশি লাগা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ওজন বৃদ্ধির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া কিছু হরমোনজনিত অবস্থা এবং নির্দিষ্ট ওষুধ—যেমন কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, স্টেরয়েড ও ডায়াবেটিসের ওষুধ—ওজনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী ওজন বৃদ্ধি হলে এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৭. শুধু ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না
প্রতিদিন শরীরের ওজন কিছুটা ওঠানামা করতেই পারে। শরীরে পানি জমা, বেশি লবণ খাওয়া, হরমোনের পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা পরিপাকতন্ত্রে খাবার থাকার মতো বিষয়েও ওজন সাময়িকভাবে বাড়তে পারে।
আবার শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম শুরু করলে শরীরের চর্বি কমার পাশাপাশি পেশি বাড়তে পারে। ফলে শরীরের গঠন বদলালেও ওজনের কাঁটায় খুব বেশি পরিবর্তন নাও দেখা যেতে পারে।
তাই একটি দিনের ওজনের পরিবর্তনের বদলে দীর্ঘ সময়ের প্রবণতার দিকে নজর দেওয়া ভালো। কোমরের মাপ, পোশাকের ফিটিং, শারীরিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সূচকও শরীরের পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।










































