খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
দেশের অর্থপাচার প্রতিরোধে অনন্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে সংস্থাটির কার্যক্রম যেন নথিপত্রেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পালাবদলে রীতিমতো গা ঝেড়ে বসেছে সংস্থাটি। তখন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে কাজের গতি। চলে একের পর এক ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনা। বাদ যায়নি পলাতক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার, সাবেক স্পিকার, মন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, আমলা, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রধান, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার শত শত মানুষ।
এ ছাড়া নজর কাড়ে হাসিনা পরিবারসহ ও বড় ১০ শিল্পগ্রুপের অর্থ লেনদেনে লাগাম টানা। সেই সঙ্গে পাচারের অর্থ ফেরাতে একের পর এক ছক কষছে সংস্থাটি। সর্বশেষ আরও ৪০০ পাচারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ ফেরাতে জাল পেতেছে বিএফআইইউসহ অন্যরা। এসব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের পাচারের পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ধাপে ধাপে তাদের পাচারের অর্থ উদ্ধারে একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য গঠন করা হয়েছে ‘সমন্বিত যৌথ টাস্ক ফোর্স’। তথ্য সূত্র: সারাবাংলা ডট নেট।
টাস্ক ফোর্স কর্মকর্তারা জানান, পাচারের সঙ্গে জড়িত ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ উদ্ধারে পুরোদমে কাজ করছে এজেন্সিগুলো। তাদের হিসাবে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকের হিসাব এরই মধ্যে অবরুদ্ধ কিংবা জব্দ করা হয়েছে। তদন্তের জন্য কোনো কোনো হিসাব জব্দের মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়নোও হয়েছে। অন্তত ১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ব্যক্তির মধ্যে অধিকাংশ পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা, আমলা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার বদলের পর মোট ফ্রিজ করা হিসাব সাড়ে ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। তার মধ্যে বিএফআইইউ জব্দ করেছে প্রায় ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দুই হাজার হিসাব। সেখানে অবরুদ্ধ রয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জব্দ করেছে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি হিসাব। মামলা করেছে ১৩৫টি। সংস্থাটির জব্দ করা হিসাবে আটকা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জব্দ করেছে ১৮৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব। সেখানে আটকা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
বিএফআইইউর প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০ শিল্পগ্রুপের ১১টি অগ্রাধিকার কেসে ৭৬ হাজার কোটি টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তার মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার কোটি ও বিদেশে ১৯ হাজার কোটি টাকা। আর হাসিনা পরিবারের জব্দ করা হিসাব ১৫৫টি, এস আলম পরিবারের ২২৭টি। পাশাপাশি ৪২টি অন্য গ্রুপের পাচারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এসব টাকা উদ্ধারে বিদেশে ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আর দেশে থাকা টাকা উদ্ধারে মামলাসহ যাবতীয় চেষ্টা চলমান রয়েছে।
তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মে পর্যন্ত বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং (এসটিআর) ছিল ২৭ হাজার ১৩০টি। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসটিআর এবং স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি (এসএআর) ঘটেছে ৩০ হাজার ১৯৯টি, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এসটিআর হয়েছিল ১৭ হাজার ৩৪৫টি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসটিআর ছিল ১৪ হাজার ১০৬টি। মূলত জুলাই বিপ্লবের পর এ ধরনের রিপোর্টিং ব্যাপক বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএফআইইউ ৭৯টি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেয় এবং জাতীয় পর্যায়ে ৪৪০টি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হয়, যার মধ্যে ২৯৭টি প্রকাশ গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু ৪৩টি প্রতিবেদন স্পর্শকাতর বলে প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, ‘বিএফআইইউর কাজের গতি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বড় ১০ গ্রুপ ও হাসিনা পরিবারের মামলা দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি করা হবে। আর ৪২টি গ্রুপের অর্থ উদ্ধারে বিদেশে ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকশ গ্রুপ এবং ব্যক্তির হিসাবে জাল পাতা হয়েছে। নির্ধারিত ছক অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি জানান, এসব কাজ দ্রুত করতে সংস্থাটিকে ঢেলে সাজাতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিএফআইইউ উপ-প্রধান কমিটির প্রধান। এখন আর দুদক, সিআইডি, এনবিআরসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। তখন অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং পাচার করা অর্থ ফেরাতে আর ১০-১৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। যার শুরু এরই মধ্যে দৃশ্যমান। আইনি ক্ষমতা পেলে পাচারকারীরা হাত গুটিয়ে ফেলবে বলে আশা করা যায়।
বিএফআইইউর প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ১৩ হাজার ৮৫৮টি এসটিআর ও এসএআর প্রতিবেদন করেছে এবং ৭৯টি গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসটিআর ছিল ১৪ হাজার ১০৬টি।
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, অস্ট্রিয়া, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, সেন্ট লুসিয়া ও তুরস্কের সাতটি শহরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পাচার হওয়া সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
নথি অনুযায়ী, সরকার বদলের পর ফ্রিজ করা হিসাবের পরিধি ৬ শতাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এবং নয় হাজারের বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের পর কিছু হিসাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয় সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো। পাশাপাশি সম্পদ জব্দ এবং বিও হিসাবের শেয়ার জব্দ করা হয়। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ১ হাজার ৩৭৪ ব্যাংক হিসাবে ৬১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। আর ১৮৮টি বিও হিসাবে প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার শেয়ার জব্দ করা হয়েছিল।
মানিলন্ডারিং আইনে অভিজ্ঞ বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন বলেন, ‘আসলে পাচার করা অর্থের যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তা আইনি প্রক্রিয়ায় হিসাব করা না। ফলে এর আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। আর পাচারের প্রসেস চিহ্নিত করতে হবে। যা ডকুমেন্টের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। মিউচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্সের জন্য তো প্রত্যেকটি দেশের জন্য আলাদা চুক্তি করতে হবে। আসলে যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে তারা তো আমাদের চেয়ে শক্তিশালী। ফলে তারা বিষয়টি কীভাবে দেখবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।’
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৮ মে দুদক কর্মকর্তারা জানান, তারা ১০ মাসে আদালতের ১২৮টি আদেশের মাধ্যমে ২ হাজার ৩৪৬টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দেশীয় সম্পদ জব্দ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দুদকের ২০২৫ সালের কার্যক্রম প্রতিবেদনে ডিসেম্বর ২০২৪-অক্টোবর ২০২৫ সময়ে দেশীয় ব্যাংক হিসাবের ২২ হাজার ২২৬ কোটি টাকা ফ্রিজ করার তথ্য দেওয়া হয়।











































