শাহ তানভীর আহমেদ।।
একসময় শিল্প ও বন্দরনগরী হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা খুলনা শহর এখন ক্রমেই খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুড ও বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকানে ভরে উঠছে। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি-প্রায় সর্বত্রই নতুন নতুন খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
তবে রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়লেও খাবারের মান, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানে খাবার তৈরির পরিবেশ, কর্মীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, রান্নাঘর ও বাসনপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একই তেলে বারবার খাবার ভাজা, খোলা অবস্থায় খাবার রাখা, অপরিষ্কার পানি ব্যবহারসহ নানা অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষ করে ব্যস্ত এলাকাগুলোতে অল্প জায়গায় গড়ে ওঠা কিছু হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নাঘরের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে ক্রেতাদের। বাইরে থেকে পরিপাটি ও আকর্ষণীয় পরিবেশ দেখা গেলেও রান্নাঘরের ভেতরের চিত্র অনেক সময় ভিন্ন বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন নিয়মিত ভোক্তা।
নগরীর কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পরিবার নিয়ে বাইরে খেতে গেলে খাবারের স্বাদ বা পরিবেশের পাশাপাশি খাবারটি কতটা নিরাপদ-সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের অভিযোগ, সব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে কি না, তা বোঝার উপায় নেই।
স্কুল শিক্ষক মাহফুজা বেগম বলেন, “বাইরে থেকে খাবার দেখতে ভালো লাগলেই তো হবে না। খাবার কীভাবে তৈরি হচ্ছে, রান্নাঘর কতটা পরিষ্কার, ব্যবহৃত পানি নিরাপদ কি না-এসবও নিশ্চিত হওয়া দরকার। নিয়মিত তদারকি থাকলে ব্যবসায়ীরাও সতর্ক থাকবেন।”
ব্যবসায়ী শাকিল আহমেদ বলেন, “রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু খাবারের মান যাচাইয়ের বিষয়টি সাধারণ ক্রেতার পক্ষে সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত অভিযান ও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা দরকার।” খুলনায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জেলা কার্যালয় ও মেট্রোপলিটন কার্যালয় রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকদের সঙ্গে সভা এবং খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণের কার্যক্রমও হয়েছে।
তবে নগরবাসীর প্রশ্ন-এত বিপুল সংখ্যক হোটেল-রেস্তোরাঁর তুলনায় মাঠপর্যায়ের নজরদারি কতটা নিয়মিত ও কার্যকর? নগরীর সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। রেস্তোরাঁ মালিক ও কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, রান্নাঘরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা, নিরাপদ পানি ব্যবহার, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদাভাবে সংরক্ষণ এবং খাদ্য উপকরণের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
একজন খাদ্যসচেতন নাগরিক বলেন, “ভোক্তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। একটি রেস্তোরাঁর সুন্দর সাজসজ্জার চেয়ে রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং খাবারের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকারি সংস্থার নয়-ব্যবসায়ীদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রমের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ মালিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খুলনা কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। ২০২৬ সালেও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকদের সঙ্গে একাধিক সভার নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে।
তবে নগরবাসীর দাবি, কার্যক্রম যেন শুধু নোটিশ, সভা বা প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন ও কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান হতে হবে।
খুলনা একসময় শিল্পকারখানা, নদীবন্দর ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল। সময়ের পরিবর্তনে নগরীর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চিত্রও বদলেছে। মানুষের জীবনযাত্রা ও ভোক্তা চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে খাবারের ব্যবসাও এখন নগর অর্থনীতির একটি দৃশ্যমান অংশ।
কিন্তু রেস্তোরাঁর সংখ্যা বৃদ্ধি যেন খাদ্য নিরাপত্তার সংকট তৈরি না করে, সেদিকে এখনই নজর দেওয়া জরুরি। নগরবাসীর প্রত্যাশা-খাবারের দোকান বাড়বে, ব্যবসা বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে; কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত হবে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। কারণ খুলনা শুধু ‘রেস্তোরাঁর নগরী’ নয়-এটি মানুষের বসবাসের নগরী। আর এই নগরীর প্রতিটি মানুষের নিরাপদ খাবার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।











































