স্টাফ রিপোর্টার।।
এক সময়ের শহরকেন্দ্রিক ও ঢাকানির্ভর রোগ ‘ডেঙ্গু’ এবার দেশের গ্রাম, আধা-শহরাঞ্চল এবং দূরবর্তী মফস্বল এলাকাগুলোতেও মারাত্মক থাবা বসিয়েছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে এখন খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ভিড় করছেন হাজার হাজার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, বর্ষার ধরন বদল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শহর থেকে গ্রামে মানুষের অবাধ যাতায়াতের কারণেই এই বিপজ্জনক ভৌগোলিক বিস্তার ঘটছে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন ও বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবকটি বিভাগীয় ও জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে রেকর্ড ২৮৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৬০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২৪ জন নতুন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে খুলনা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৯৫ জন এবং খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ৪৯১ জনের জায়গায় নতুন ৪৮ জনসহ বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮,১৯৯ জনে এবং প্রাণহানি ঘটেছে ২৭ জনের।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সিএমএইচ, চমেক ও মা-শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তেজগাঁওয়ের চার বছরের শিশু রুজাইনা মজিদ এবং সন্দ্বীপের বাসিন্দা রাশেদা বেগম (২৯) নামের দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৬৮৯ জনে এবং মৃতের সংখ্যা ৯।
বরিশাল বিভাগের চিত্রও আশঙ্কাজনক। বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য মতে, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঝালকাঠির বাসিন্দা কবির হোসাইন (৩৫) মারা গেছেন।
এ নিয়ে বিভাগে ডেঙ্গুতে মোট ১২ জনের মৃত্যু হলো, যার মধ্যে পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দার সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে এই বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭,৮৮০ ছাড়িয়েছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাবনা ও নাটোর থেকে আসা রোগীর চাপের মধ্যে বনপাড়ার কলেজ শিক্ষার্থী জিত সরকার (২২) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাত (২০) নামের এক যুবকের মৃত্যুতে জেলাটিতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে।
কীটতত্ত্ববিদ ও পরিবেশ গবেষকদের মতে, ২০১৯ সালের পর বাংলাদেশে ডেঙ্গু বিস্তারের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জেলা ও উপজেলা শহরগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। শহরের ডেল্টা ট্রাফিক, নির্মাণাধীন ভবন, প্লাস্টিক বোতল, টায়ার ও ছাদের জমা পানি এডিসের স্থায়ী আবাসে পরিণত হয়েছে। যখন শহর থেকে ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী কোনো ব্যক্তি গ্রামে ফিরছেন, তখন স্থানীয় এডিস মশা তাঁকে কামড়ে সুস্থ মানুষদের মাঝে ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের নতুন চক্র তৈরি করছে।








































