ঝিনাইদহ প্রতিনিধি।।
বাবার পকেট থেকে টাকা নিয়েছিলেন। পরে বাবার বকুনি খেয়ে কীটনাশক পানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ইসলাম। দুই বোনের ঝগড়ায় মায়ের বকুনি খেয়ে অভিমানে আকলিমা কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করেন। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে মারা যান বুড়ি বিবি। এভাবে একই পরিবারের ৩ সদস্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী গ্রামের আবুল হোসেনের সাজানো সংসার অল্প সময়ের ব্যবধানে তছনছ হয়ে যায়।
আবুল হোসেনের ছোট ছেলে আতিয়ার রহমান জানিয়েছেন, তারা সাত ভাই-বোন। তাদের মধ্যে বোন আকলিমা এবং ভাই ইসলাম হোসেন ও মতিয়ার রহমান কীটনাশক পানে মারা গেছেন। তারা একদমই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অভিমানে আত্মহত্যা করেছেন। মেজো ভাই ইসলাম বাবার পকেট থেকে টাকা নিয়েছিল। এটা নিয়ে বাবা তাকে বকাঝকা করে। এতেই সে কীটনাশক পান করে। বোন আকলিমা আরেক বোনের সাথে ঈদের দিন ঝগড়া করে। এ নিয়ে মা আকলিমাকে বকা দেয়। পরে আকলিমা কীটনাশক পান করেন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়। বড় ভাই মসলেমের সঙ্গে ভাবির ঝগড়া হয়। এতেই ভাবি বুড়ি বিবি কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেন। আরেক ভাই মতিয়ার বোতলে রাখা কীটনাশককে মধু ভেবে খেয়ে প্রাণ হারান। সন্তানদের শোকেই বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়েন।
মসলেম হোসেন বলেন, “পরিবারের কয়েক সদস্যের আত্মহত্যার শোক সইতে না পেরে বাবা-মা মারা গেছেন। এখন বেঁচে আছি দুই ভাই ও দুই বোন। আমি পৈতৃক ভিটা থেকে সরে অন্য জায়গায় বাড়ি করেছি। আত্মহত্যা কোনো কিছুর সমাধান হতে পারে না। আত্মহত্যায় আমাদের পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। কেউ যেন আত্মহত্যার পথ বেছে না নেন।”
বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ জেলা ঝিনাইদহ। ২০২৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এ জেলায় প্রতিদিন গড়ে একজন আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধানে বিভিন্ন এনজিও কাজ করছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, কীটনাশকের সহজলভ্যতা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ, প্রেম, বাল্যবিবাহ, বিষন্নতার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ১৮৯ জন আত্মহত্যা করেছেন এ জেলায়। তাদের মধ্যে পুরুষ ৯২ জন ও নারী ৯৭ জন। ৬ মাসে আত্মহত্যার শীর্ষে রয়েছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা। এ উপজেলায় ৫৯ জন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এছাড়া, শৈলকুপায় ৪৪, হরিনাকুন্ডতে ২৫, কোঁটচাদপুরে ২১, কালীগঞ্জে ২০ ও মহেশপুরে ২০ জন আত্মহত্যা করেছেন।
ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারের দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত আত্মহত্যার কোনো রেকর্ড ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারের দপ্তরে না থাকলেও ওই সময়ে আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর সংখ্যা ২৫ হাজারের কাছাকাছি।
ঝিনাইদহ জেলায় ২০১০ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩৮০ জন আর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ২,১০৯ জন। ২০১১ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩০৯ জন, চেষ্টা করেছেন ২,৮৪৯ জন; ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেছেন ২৯৫ জন, চেষ্টা করেছেন ২,৫৮৩ জন; ২০১৩ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩১১ জন, চেষ্টা করেছেন ২৬৩৯ জন; ২০১৪ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩০৩ জন, চেষ্টা করেছেন ২,৪০৯ জন এবং ২০১৫ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩৬৩ জন আর চেষ্টা করেছেন ২,৬০০ জনের বেশি। ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহে ৩,১৫২ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ২২ হাজার ৬৭ জন। এর ২০২০ সালে ঝিনাইদহে আত্মহত্যাকারীদের ৪৭ শতাংশই ছিল পুরুষ। ২০২০ সালে ৩২০ জন আত্মহত্যা করেন।
পরিসংখ্যান থেকে আরো জানা গেছে, ২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী ছিলেন ১৬৮ জন এবং পুরুষ ১৩৩ জন। সব মিলিয়ে এ বছরে আত্মহত্যা করেন ৩০১ জন। আগের বছর ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেন মোট ৩১৯ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১৫২ জন এবং নারী ১৬৭ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২৮ জনে এবং ২০২২ সালে ছিল ৩২৩ জন।
আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা সোসাইটি ফর ভলান্টরি অ্যাক্টিভিটিসের (শোভা) নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের মানুষের রাগ-অভিমান বেশি। তাছাড়া, এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম। এ কারণে মানুষের মানসিক প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মানুষের সহ্যক্ষমতা মজবুত হয়।
ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে আত্মহত্যা রোধ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান জানান, দণ্ডবিধি অনুযায়ী আত্মহত্যা করা বা চেষ্টা করা অপরাধ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে সচেতন করতে পুলিশ কাজ করছে। তবে, সচেতনতাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের মূল হাতিয়ার।








































