Home Lead ৫ আগস্ট লুট হওয়া ১,৩০৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি

৫ আগস্ট লুট হওয়া ১,৩০৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি

335

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি, পুলিশ বক্স ও স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সুযোগে অস্ত্রাগার থেকে লুট হয়ে যায় বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। দুই বছর পেরিয়ে গযাওয়ার পরও উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩০৯টি অস্ত্র।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫৪টি লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩০৯টি। একই সময়ে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৫টি গোলাবারুদ উদ্ধার হলেও ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি গোলাবারুদের হদিস নেই।

অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

‘ধীরগতিতে হলেও মাঝেমধ্যে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

বিপুলসংখ্যক অস্ত্র এখনও উদ্ধার না হওয়ায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গত ২৯ আগস্ট থেকে নতুন করে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।

২৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। ইউনিটটি ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাঠে কাজ শুরু করেছে

অস্ত্র উদ্ধারে তথ্যদাতাদের জন্য আর্থিক পুরস্কারও ঘোষণা করেছে সরকার। ভারী অস্ত্রের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা; পিস্তল, রিভলবার ও শটগানের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য লুট হওয়া অস্ত্র, টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের তথ্য দিলে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, উদ্ধার হওয়া কয়েকটি অস্ত্রের তদন্তে দেখা গেছে, সেগুলো অপরাধীদের হাতে পৌঁছে হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে।

২৬ আগস্ট চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে গলাকাটা মোবারককে গ্রেপ্তারের অভিযান চলার সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে যে পিস্তলটি দিয়ে তিনি এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছিলেন, সেটি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশেরই আগ্নেয়াস্ত্র। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট করা হয়েছিল ওই ৯ মিমি পিস্তলটি।

গ্রেপ্তারের পর মোবারক পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, সেই অস্ত্রটি তিনি আরেক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে পেয়েছিলেন। এই পিস্তল নিয়ে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৫৪টি।

পুলিশের হিসাব বলছে, লুট হওয়া অস্ত্রের ছিল ১ হাজার ১১৪টি চায়না রাইফেল, ২৫৩টি চায়না এসএমজি, ৩৪টি এলএমজি, ৫৩৯টি ৭.৬২ মিমি পিস্তল, ১ হাজার ৯২টি ৯ মিমি পিস্তল ও ২ হাজার ৭৯টি ১২ বোরের শটগান।

এখনো উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ১০৯টি চায়না রাইফেল, ৩০টি চায়না এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ মিমি পিস্তল, ৪৪২টি ৯ মিমি পিস্তল, ৩৮৪টি ১২-বোর শটগান, ১২৮টি গ্যাস গান, ৭টি ৩৮ মিমি টিয়ার-গ্যাস লঞ্চার ও দুটি সিগন্যাল পিস্তল।

এছাড়া বিপুলসংখ্যক গুলি, টিয়ার গ্যাসের শেল ও গ্রেনেড, সাউন্ড গ্রেনেড, স্মোক গ্রেনেড ও ফ্ল্যাশব্যাং গ্রেনেডও লুট হয়।

লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেরত দেওয়ার জন্য তৎকালীন অন্তবর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব অস্ত্র ফেরত না আসায় ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় যৌথ অভিযান। মাত্র নয় দিনের মধ্যে ১৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার ও ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, লুট হওয়া কিছু অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে গেছে। আবার কিছু অস্ত্র হয়তো আতঙ্কিত বা উত্তেজিত মানুষ নিয়ে যাওয়ার পর ফেলে দিয়েছে কিংবা পরে জমা দিয়েছে।

তবে এখনো যে ১ হাজার ৩০৯টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি, সেগুলোর কতটি কার হাতে, কোথায় রয়েছে কিংবা কতগুলো সীমান্ত পেরিয়ে গেছে, এর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পুলিশের কাছে নেই।

পুলিশ সদর দপ্তরের থেকে এখনো সব লুট হওয়া অস্ত্রের স্থাপনা-ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশিত হয়নি। কোন স্থাপনা থেকে কোন ধরনের অস্ত্র লুট হয়েছিল এবং উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর কোনটি পুলিশের কোন ইউনিট বা সদস্যের নামে বরাদ্দ ছিল, সে তথ্যও স্পষ্ট নয়।

যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টিবিএসকে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি, সেগুলো অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে চলে যাওয়া অস্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে গিয়ে অভিযান চালাতে পারে না। তবে দেশের ভেতরে যেসব অস্ত্র পাওয়া যাবে, সেগুলো উদ্ধার করা হবে।

শুধু চট্টগ্রাম মহানগরের আট থানাসহ ২৯টি পুলিশ স্থাপনা থেকে ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ৭৯৭টি অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো ১৪৭টির সন্ধান মেলেনি।

সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানগুলো থেকে বোঝা যায় অস্ত্রগুলো কত দীর্ঘ সময় ধরে লুকিয়ে রাখা হতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া দুটি ৯ মিমি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। আগস্টে নারাওঙ্গঞ্জের আড়াইহাজারে মাছ ধরার সময় এক জেলের জালে উঠে আসে একটি শটগান। পরে রেজিস্টার যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, অস্ত্রটি আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি।

উদ্ধারকৃত বেশ কয়েকটি অস্ত্র অপরাধের সঙ্গেও যুক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেন থেকে এক নারীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যায় ব্যবহৃত পিস্তলের সন্ধান করতে গিয়ে উঠে আসে, সেটি ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে অস্ত্র।

লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির সঙ্গে কনস্টেবল মো. রিয়াদের জড়িত থাকার প্রমাণও পেয়েছে পুলিশ। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তিনিসহ আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রিয়াদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অবশিষ্ট অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অভিযান চলছে।

লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি।