আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
কাশ্মীরকে বলা হয় ভূ-স্বর্গ। কিন্তু পাকিস্তান সেই ভূ-স্বর্গকে রীতিমতো নরক বানিয়ে ফেলেছে।
পাকিস্তানি পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী এবং সেনাবাহিনী সেখানে রক্তের হোলিখেলায় মেতেছে। গত ৫ জুন থেকে ৩৮ দফা দাবিতে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে এখন পর্যন্ত এক শরও বেশি মানুষ মারা গেছে। গত ২৭ জুলাই সাধারণ নির্বাচন শুরুর পর গত এক সপ্তাহেই প্রাণ হারিয়েছে ৫০ জনেরও বেশি।
কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোনো স্বীকৃত সীমান্ত নেই।
আছে নিয়ন্ত্রণ রেখা, যার দুই পাশেই কাশ্মীর। চলমান সংঘাত অনেককে ৯০ দশকের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক পুলিশ মহাপরিচালক এস পি বৈদ সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ১৯৯০-এর দশকে নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে পাকিস্তান অংশের মসজিদ থেকে মাইকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পাকিস্তানে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো ঘোষণা দেয়া হতো। সেই ঘোষণা শুনে তখন জম্মু ও কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার বেশ কয়েকজন তরুণ সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে চলেও গিয়েছিল।
সেই একই মসজিদের মাইকের ঘোষণা এখন আবার সবাইকে সচকিত করছে। তবে ঘোষণার ধরন বদলে গেছে। এখন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের মসজিদের ঈমামরা কাশ্মীরিদের পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আহ্বান জানাচ্ছেন। এস পি বৈদ বলেন, ‘কর্মফল এখন ফেরত আসছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যে অঞ্চলটিকে একসময় সন্ত্রাসবাদ ও অশান্তি ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করত।
সেখানেই এখন বিদ্রোহ দেখা দিচ্ছে। অরাজনৈতিক সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির নেতৃত্বে গত ৫ জুন থেকে ৩৮ দফা দাবিতে কাশ্মীরে আন্দোলন হচ্ছে। মূলত মুদ্রাস্ফীতি, লোডশেডিং, আটার ঘাটতি এবং কয়েক দশকের সামরিক দমনপীড়ন, নিপীড়ন, বৈষম্য ও অত্যাচার থেকে সৃষ্ট পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই এবারের আন্দোলন। তবে এবার ৩৮ দফার মূল দাবি হলো সংসদে কাশ্মীরের বাইরে থাকা কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল।
আন্দোলনকারীদের দাবি, এই সংরক্ষিত আসন দিয়েই ইসলামাবাদ বরাবর কাশ্মীরের ওপর নিজের ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পায়। আন্দোলন শুরুর পর থেকেই ইসলামাবাদ আলোচনার বদলে নিষ্ঠুরতাকে হাতিয়ার করে। আন্দোলনকারীদের পিছু হটাতে সরকার নিষ্ঠুর দমননীতির পাশাপাশি অঞ্চলটিতে খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী পণ্যের প্রবেশ সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা বন্ধ করে দেয়ায় ফলে ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবাসমূহ অচল হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, কারফিউ জারি করে সরকার কাশ্মীরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষ অনুমতি নিয়ে বিবিসির প্রতিনিধি বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রস্থল পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের রাওলাকোট পরিদর্শন করেন। বিবিসি প্রতিনিধি সেখানে এক মর্মান্তিক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেন। পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করে গুলি করছে।
রাওলাকোটে প্রধান বিক্ষোভস্থলের কাছে একটি অস্থায়ী ক্লিনিক স্থাপনকারী একজন স্থানীয় চিকিৎসক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, নিহত বা গুরুতর আহত বেসামরিক নাগরিকদের বেশির ভাগই ১৫-১৬ বছর থেকে ৩২-৩৫ বছর বয়সী তরুণ।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেই চিকিৎসক বলেন, ‘আমি ৪০ বছরের বেশি বয়সী রোগী খুব কমই দেখেছি।
তিনি জানান, ইসলামাবাদের বাহিনীর গুলিতে আহত মানুষদের তার ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলেও, আশঙ্কাজনক রোগীদের সামলানোর জন্য তাদের উন্নত চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, ’প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম আমাদের আছে। আমরা রক্তপাত বন্ধ করতে পারি, ক্ষত পরিষ্কার ও ড্রেসিং করতে পারি এবং ত্বকের ওপরের দিকের বুলেট বের করতে পারি। কিন্তু বুক, পেট, মাথা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজন। তবে একসঙ্গে অনেক রোগী চলে আসলে এমনকি বড় হাসপাতালগুলোও হিমশিম খাবে।’
এই ক্লিনিকে ভর্তি থাকা বন্ধুর সাথে দেখা করতে আসা আলী নামের এক তরুণ চোখ মুছতে মুছতে বলেন বলেন, ‘আমরা শুধু ন্যায্যমূল্যে আটা, বিদ্যুৎ এবং আমাদের মৌলিক অধিকারের দাবি জানিয়েছিলাম। এর বদলে আমাদের ভাইদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের অপরাধ কী ছিল? কেন আমাদের ওপর তাজা গুলি চালানো হচ্ছে?’
বিবিসি আসমা নামের এক নারীর সাথেও কথা বলেছে, যিনি নিজে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় জানতে পারেন যে তার একমাত্র ছেলেকে গুলি করা হয়েছে।
আসমা বলেন, ‘আমরা শুধু আমাদের অধিকার চেয়েছিলাম। আমরা সন্ত্রাসী নই।’ আসমা আরও বলেন, ‘আমার ছেলে জানতো এখানে ঝুঁকি আছে, কিন্তু ও বিশ্বাস করত যে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি। ও প্রায়ই বলত যে ন্যায্য দাবির জন্য প্রাণ দেওয়া একটি সম্মানের বিষয়।’
রাওলাকোটের আরেক বাসিন্দা সালমান তার ছোট ভাইকে হারিয়েছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘সে ছিল পরিবারের সবার ছোট এবং সবার আদরের। এটি আমাদের জন্য এক বিশাল ক্ষতি। একই সাথে, আমি গর্বিত যে মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে সে নিজের জীবন দিয়েছে। সে কারও সাথে মারামারি বা কাউকে আক্রমণ করছিল না।’
সাবেক পাকিস্তানি সেনা সদস্য আইয়ুবও পুলিশের অভিযানে তার ছেলেকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। আমি জেনারেল জিয়া-উল-হক এবং জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনের সময়কাল দেখেছি। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তেমন কিছু আমি কখনো দেখিনি। আমার মতে, এটি চরম অবিচার। আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি। আন্দোলনকারীদের কেউই কোনো অন্যায় করেনি।’










































