স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনন্য এক নাম ‘খুলনা জিলা স্কুল’। ইতিহাস, গৌরবময় অর্জন, বর্তমান অবস্থান ও উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে প্রায় ১৪০ বছরের ঐতিহ্যকে সঙ্গে করে এগিয়ে চলেছে এই বিদ্যাপীঠ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, স্কাউটিং, বিজ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বরাবরই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই বিদ্যাপীঠ থেকেই উঠে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিচারপতি, সচিব, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, খ্যাতনামা ক্রীড়াবিদ ও দেশবরেণ্য নানা গুণী ব্যক্তিত্ব।
প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যাপীঠ
এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল (১৯৩৩–১৯৩৭ সাল)। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা মেজর এম এ গনি ছিলেন এই স্কুলেরই ছাত্র। এছাড়াও উপন্যাসিক ইমদাদুল হক, জাতীয় কবি ফররুখ আহমদ, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার নুরুল মোমেন, পাকিস্তানের সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী খান-এ-সবুর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কৃষি উপদেষ্টা সি এস করিম, বিচারপতি মকসুমুল হাকিম ও সাহিত্যিক আনিস সিদ্দিকী এই স্কুলের আঙিনাতেই গড়ে উঠেছিলেন।
সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনেও জিলা স্কুলের অবদান অনস্বীকার্য। প্রখ্যাত অভিনেতা নাদিম, গোলাম মোস্তফা, উজ্জ্বল, নাজমুল হুদা এবং ঢালিউডের প্রয়াত রাজপুত্র সালমান শাহ ছিলেন এখানকার শিক্ষার্থী। বর্তমান জাতীয় ক্রিকেট দলের উইকেটকিপার-ব্যাটার নুরুল হাসান সোহান এবং প্রয়াত তারকা ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানাও এই স্কুলের ছেলে। সাবেক সচিব আশরাফুল মকবুল, শেখ ওয়াহিদুজ্জামান, বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক মো. রেজাউল হকসহ অসংখ্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই ঐতিহ্যবাহী স্কুলেরই সৃষ্টি।

সাফল্য ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের গৌরব
যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরপর ৮ বার জিলা স্কুল প্রথম স্থান অধিকারের অনন্য রেকর্ড গড়েছিল। সম্প্রতি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ৩১ জন ট্যালেন্টপুলসহ মোট ৪৬ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে।
সহশিক্ষা কার্যক্রমে খুলনা জিলা স্কুলের স্কাউট দল ও ব্যান্ড দল সুপরিচিত। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিলয় জোয়ার্দ্দার দ্বীপ, সেখ ইফতেখার সাকিব, মো. নাফিস কবির ও সেখ ইমতিয়াজ শাকিল স্কাউটের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘প্রেসিডেন্ট স্কাউট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানচর্চায় আন্তর্জাতিক জুনিয়র সাইন্স অলিম্পিয়াড, রোবটিক্স এবং জাতীয় পর্যায়ের শিশু একাডেমির বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে পুরস্কার ছিনিয়ে আনছে জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
স্মৃতিপটে জিলা স্কুল ও বর্তমান পরিস্থিতি
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাতীয় ক্রিকেটার নুরুল হাসান সোহান বলেন, “স্কুলে যখন খেলতাম, একটা আলাদা ফিলিংস কাজ করত। বরিশাল, যশোর থেকে আসা টিমগুলোর সঙ্গে যখন খেলা হতো, শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্দীপনা ছিল বর্ণনাতীত। সেই ভালোবাসা ও আনন্দের দিনগুলো খুব মিস করি।”
বর্তমানে প্রভাতী ও দিবা—দুই শিফটে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় শ্রেণিকক্ষগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং চলছে নতুন ৬ তলা ভবনের নির্মাণকাজ। ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দুটি ঐতিহাসিক লাল ভবনকে আগের আদলেই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষকের ৬টি শূন্য পদ ও কর্মচারীর ঘাটতিসহ কিছু অবকাঠামোগত সংকট সমাধানে চেষ্টা চলছে বলে জানান খুলনা জেলা শিক্ষা অফিসার এস.এম ছায়েদুর রহমান এবং প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম। সকল বাধা পেরিয়ে শতাব্দীর ঐতিহ্য বুকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে খুলনা জিলা স্কুল।










































