কুষ্টিয়া প্রতিনিধি।।
মাত্র ২০ মিটার পাকা সড়ক। অথচ বছরের ৮ থেকে ১০ মাস এই সড়ক তলিয়ে থাকে হাঁটুপানির নিচে। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ও নন্দলালপুর ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ মানুষকে। নন্দলালপুর ইউনিয়নের হাতিসাঁকো এলাকায় ব্রিটিশ শাসনামলে রেলপথের নিচে নির্মিত টানেলটিই এখন তাদের দুর্ভোগের কারণ।
এলাকাবাসীর কাছে এই টানেলটি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা আর পরিকল্পনাহীন ভরাটের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি পরিণত হয় মরণফাঁদে। তারা বলছেন, যুগ যুগ ধরে টানেলের নিচ দিয়ে কয়া ও নন্দলালপুর ইউনিয়নের মানুষকে প্রতিদিন চলাচল করতে হয়। গত এক দশকে আশপাশের ফাঁকা জায়গাগুলো ভরাট করে বাড়িঘর, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা গড়ে ওঠায় বন্ধ হয়ে গেছে পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রাকৃতিক পথ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকল্পনার অভাব। এলাকায় নেই কোনো নালা। ফলে বর্ষা মৌসুমে জমে থাকা পানি বের হওয়ার সুযোগ নেই। সেই পানি শুকাতে শুকাতে আবার পরের বছরের বর্ষা চলে আসে। এভাবেই বছরের প্রায় আট মাস পানির নিচে ডুবে থাকে সড়কটি।
গতকাল রোববার সকালে দেখা যায়, টানেলের দুই পাশেই জমে আছে হাঁটুপানি। সেই পানির মধ্য দিয়েই কাপড় তুলে, ব্যাগ মাথায় নিয়ে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতে যাচ্ছেন মানুষ। ইজিবাইক, ভ্যান বিকল হয়ে পড়ে আছে পানির মধ্যে। এ সময় ইজিবাইকচালক রাজা আলী ক্ষোভের সুরে বলেন, পানির কারণে ব্যাটারি শর্ট হয়ে যায়। মোটর নষ্ট হয়। মেরামত বাবদ মাসে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হয়। এই পানি ঠেলে গাড়ি চালানো যায়?
আলাউদ্দিননগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে উম্মে মারিয়া। এই কিশোরীর ভাষ্য, ‘আগে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতাম। এখন হাঁটুপানি। পানির নিচে ভাঙা রাস্তায় একবার পড়ে যাই। সে জন্য এখন হেঁটে ও ভ্যানে চলাচল করি।’
একই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী হুজাইফা রহমান বলল, ‘প্রতিদিন পানি মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হয়। বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। অনেক সময় ক্লাসও করতে পারি না। পড়ালেখার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত পানি অপসারণের ব্যবস্থা করুন।’
হাতিসাঁকো এলাকার কৃষক বিষু শিকদার (৬৫) বলেন, আগে চারপাশ ফাঁকা ছিল। মহাসড়কের পাইপ দিয়ে পানি নেমে বিলে চলে যেত। গত এক দশকে যার যার মতো জায়গা ভরাট করে বাড়িঘর-দোকানপাট করেছে। পানি বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। কাছাকাছি এলাকার গৃহিণী রোজিনা খাতুনের ভাষ্য, বর্ষায় সময় থেকে পানি জমা শুরু করে। পানি সরতে সরতে চৈত্র-বৈশাখ মাস লেগে যায়। পানি শুকাতে শুকাতে আবার বৃষ্টি চলে আসে। বছরে প্রায় আট মাসের বেশি পানি থাকে বলে খুব কষ্ট করে মানুষকে চলাচল করতে হয়।
কয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন জানান, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ৭০ হাজার মানুষের উপজেলায় যাওয়ার একমাত্র পথ এটি। পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আবার রাস্তা উঁচু করলে টানেলে যানবাহন আটকে যায়। ব্রিটিশ আমলের এই উন্নয়ন আধুনিক যুগে এসে ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনকে এ বিষয়ে বারবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এলজিইডির কুমারখালী উপজেলা প্রকৌশলী মো. নাজমুল হক বলেন, এই জায়গায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি জমে থাকে। পানি বের করতে হলে মহাসড়কে একটি কালভার্ট করতে হবে, যা এলজিইডির পক্ষে করা সম্ভব নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার আশ্বাস দেন এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার। যদি বরাদ্দ আসে, পরিকল্পিতভাবে তা কাজে লাগিয়ে ভোগান্তি নিরসনে ব্যবস্থা নেবেন।










































