শামিম শিকদার।।
খুলনা মহানগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া দশম শ্রেণির স্কুলছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৭) হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য অবশেষে জট খুলেছে। লোকলজ্জা, দুটি বিয়ে ও অবাধ্যতার জেরে নিজের জন্মদাতা নেশাগ্রস্ত পিতার নির্মম আঘাতেই অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্রী। এই নৃশংস ঘটনায় জড়িত ঘাতক মা সীমা আক্তার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। এদিকে, ঘটনার পর পলাতক থাকা ঘাতক পিতা মো. আলীম হোসেন আকাশকেও অবশেষে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এই চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন মা সীমা আক্তার। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালতের নির্দেশে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জেলহাজতে পাঠানো হয়। খুলনা সদর থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. আ. সাত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতে মায়ের জবানবন্দি: যেভাবে খুন হন নির্জনা: আদালত ও কেএমপির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত বুধবার (৮ জুলাই) রাত ১০টার দিকে নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি ভবনের সামনে থেকে নির্জনার বস্তাবন্দী রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরদিন নিহতের মা সীমা আক্তার মর্গে গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করার পর থেকেই পুরো পরিবার সোনাডাঙ্গা বসুপাড়ার বাড়ি তালাবদ্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে আটক হওয়ার পর প্রথমে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তীব্র জিজ্ঞাসাবাদের মুখে আদালতে সত্য স্বীকার করেন মা সীমা। জবানবন্দিতে তিনি জানান, অল্প বয়সে পরপর দুটি বিয়ে হওয়া এবং প্রায়ই কথার অবাধ্য হয়ে বাড়ির বাইরে থাকার কারণে মেয়ে নির্জনার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন তার নেশাগ্রস্ত পিতা আলিম হোসেন আকাশ। গত বুধবার সন্ধ্যার দিকে সোনাডাঙ্গার বাসায় এই নিয়ে পারিবারিক কলহ শুরু হলে রাগের মাথায় নির্জনার মাথার পেছনে সজোরে আঘাত করেন আকাশ। এতে মুহূর্তের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে নির্জনা এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
লাশ গুমের নির্মম চেষ্টা ও নাটক: একমাত্র কন্যার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে ঘাতক পিতা আকাশ ও মা সীমা চরম অস্থির হয়ে পড়েন। লোকলজ্জা ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তারা তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতরেই নির্জনার লাশের হাত-পা বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরেন। এরপর রাতের আঁধারে সুবিধাজনক সময়ে সেই বস্তাবন্দী মরদেহ নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় ফেলে দিয়ে দুই জনেই পালিয়ে যান। লাশ বস্তাবন্দী ও গুম করার এই পুরো প্রক্রিয়ায় ঘাতক স্বামীকে সরাসরি সহযোগিতা করেছিলেন মা সীমা নিজে।
পরদিন বৃহস্পতিবার মর্গে গিয়ে মা সীমা আক্তার সাংবাদিকদের কাছে মেয়ের বিয়ে ও চিঠি লিখে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য দিয়ে পুরো দায় নির্জনার সাবেক স্বামীর ওপর চাপানোর চেষ্টা করে নাটক সাজিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
আলামত সংগ্রহ ও আজ কেএমপির সংবাদ সম্মেলন: খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল ও নিহতের বাড়ি থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ইতিপূর্বেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) মিডিয়া সেল জানিয়েছে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত, তদন্তের অগ্রগতি এবং ঘাতক বাবা-মায়ের অপরাধের সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে উন্মোচন করতে শনিবার (১১ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় কেএমপি সদর দপ্তরে এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলন (প্রেস ব্রিফিং) আহ্বান করা হয়েছে। নিজের জন্মদাতার এমন পাশবিকতায় একটি কিশোরী প্রাণের অকাল মৃত্যুতে গোটা খুলনা অঞ্চলজুড়ে এখনো তীব্র ক্ষোভ, নিস্তব্ধতা ও ধিক্কারের ঝড় বইছে।










































