স্টাফ রিপোর্টার।।
অবশেষে খুলনার স্কুলছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। কোনো ‘অনার কিলিং’ বা প্রেমিকের হিংস্রতা নয়, বরং নিজের জন্মদাতা নেশাগ্রস্ত পিতার নির্মম আঘাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এই মেধাবী ছাত্রী। পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দিতে চরম অস্থিরতার মধ্যে লাশের হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দী করে নিরালা এলাকায় ফেলে পালিয়ে যান ঘাতক পিতা।
শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকেলে খুলনা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের বিচারক ফারুক ইকবালের খাস কামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া এক চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন নিহতের মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা। আদালত সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের এই রোমহর্ষক বর্ণনা দেওয়ার পর মা সীমা আদালত কক্ষেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিচারক তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতে মায়ের জবানবন্দি: যেভাবে খুন হন নির্জনা: খুলনা সিএমএম আদালত ও কেএমপির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত বুধবার (৮ জুলাই) রাতে নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার সড়ক থেকে নির্জনার বস্তাবন্দী রক্তাক্ত লাশ উদ্ধারের পর থেকেই তার মা-বাবা বসুপাড়ার বাড়ি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত অভিযানে মা সীমা আটক হওয়ার পর প্রথম দিকে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং নির্জনার সাবেক স্বামীর ওপর দোষ চাপান। তবে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি সত্য স্বীকার করেন।
সীমা জানান, অল্প বয়সে পরপর দুটি বিয়ে হওয়া এবং প্রায়ই কথার অবাধ্য হয়ে বাড়ির বাইরে থাকার কারণে মেয়ে নির্জনার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন তার নেশাগ্রস্ত পিতা আলিম হোসেন আকাশ। গত বুধবার সন্ধ্যার দিকে সোনাডাঙ্গা বসুপাড়ার বাসায় এই নিয়ে ফের পারিবারিক কলহ শুরু হলে রাগের মাথায় নির্জনার মাথার পেছনে সজোরে আঘাত করেন আকাশ। এতে মুহূর্তের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে নির্জনা এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
লাশ গুমের নির্মম চেষ্টা ও পিতার পলায়ন: একমাত্র কন্যার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে ঘাতক পিতা আকাশ ও মা সীমা চরম অস্থির হয়ে পড়েন। লোকলজ্জা ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তারা তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতরেই নির্জনার লাশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরেন। এরপর রাতের আঁধারে সুবিধাজনক সময়ে সেই বস্তাবন্দী মরদেহ নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় ফেলে দিয়ে দুই জনেই আত্মগোপনে চলে যান। লাশ বস্তাবন্দী ও গুম করার এই প্রক্রিয়ায় ঘাতক স্বামীকে সরাসরি সহযোগিতা করেছিলেন মা সীমা নিজে।
শনিবার কেএমপির প্রেস ব্রিফিং: খুলনা সদর থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জানিয়েছে, ঘাতক পিতা আলিম হোসেন আকাশ এখনো পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের জন্য সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম।
এদিকে, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত, তদন্তের অগ্রগতি এবং ঘাতক পিতাকে গ্রেফতারের অভিযানের সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে শনিবার (১১ জুলাই) সকালে কেএমপির সদরদপ্তরে একটি বিশেষ প্রেস ব্রিফিং আহ্বান করা হয়েছে। নিজের জন্মদাতার এমন পাশবিকতায় একটি কিশোরী প্রাণের অকাল মৃত্যুতে গোটা খুলনা অঞ্চলজুড়ে এখনো তীব্র ক্ষোভ ও শোকের আবহ বিরাজ করছে।










































