Home Lead বর্ষা এলেই ‘নদী’ হয় খুলনা: অপরিকল্পিত উন্নয়নের ড্রেন এখন নগরবাসীর গলার কাঁটা!

বর্ষা এলেই ‘নদী’ হয় খুলনা: অপরিকল্পিত উন্নয়নের ড্রেন এখন নগরবাসীর গলার কাঁটা!

17


অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও সংস্কারহীন খালের খেসারত দিচ্ছেন নগরবাসী, তলিয়ে গেছে ভিআইপি এলাকাও

স্টাফ রিপোর্টার।।

বিপুল অর্থ ব্যয়ে নতুন নালা (ড্রেন) ও কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও খুলনা নগরবাসীর জলাবদ্ধতার চিরচেনা দুর্ভোগের কোনো অবসান হয়নি। সামান্য বৃষ্টির ছোঁয়াতেই থমকে যাচ্ছে খুলনা মহানগরীর স্বাভাবিক ছন্দ। রাস্তাঘাট ছাপিয়ে পানি ঢুকে পড়ছে মানুষের শোবার ঘর ও দোকানপাটে। গত বুধবার (৮ জুলাই) রাতভর দফায় দফায় বর্ষণে খুলনা নগরীর প্রধান প্রধান সড়কসহ অলিগলি যেন একেকটি নদীতে পরিণত হয়েছে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোর ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর এই সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ অধিকাংশ নিচু এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত বছরগুলোতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও টেকসই সুফল না মেলায় ক্ষোভ ফেটে পড়েছেন নগরবাসী।

পানির নিচে ভিআইপি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ: সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন রাস্তা মোড় থেকে খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল (আবু নাসের হাসপাতাল) মোড় এবং মুজগুন্নি সড়কের বড় অংশই এখন পানির নিচে। এছাড়াও উল্লাস পার্ক মোড়, আহসান আহমেদ রোড, রয়্যাল মোড়, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চানমারী, লবণচরা, টুটপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া ও রূপসা নতুন বাজারসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। মুজগুন্নি আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, এটি একটি ভিআইপি এলাকা এবং এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও পুলিশের কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও প্রধান সড়ক থেকে বাসা পর্যন্ত আসতে মানুষকে হাঁটু সমান পানি মাড়াতে হচ্ছে।

‘উন্নয়নের’ ড্রেন এখন গলার কাঁটা! ভুগোলের নিয়ম উল্টে দিয়ে তৈরি করা ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেই এই দুর্ভোগের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগীরা। নগরবাসীর অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে উন্নয়নের নামে ড্রেনগুলোর বেড বা তলদেশ এত উঁচুতে করা হয়েছে যে, মানুষের বসতবাড়ি ও দোকানগুলো ড্রেনের চেয়ে নিচু হয়ে পড়েছে। ফলে বাড়ির ভেতরের পানি সড়কে না গিয়ে, উল্টো ড্রেনের নোংরা পানি উপচে ঘরবাড়িতে ঢুকছে।

তাছাড়া, রূপসার পাম্প হাউস বন্ধ থাকা এবং স্লুইস গেটগুলো অকেজো থাকায় পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। এর ওপর জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানি নালা দিয়ে উল্টো শহরের স্ট্যান্ড রোড, চানমারী ও কেএমপি সদরদপ্তর এলাকায় প্রবেশ করে প্লাবন সৃষ্টি করছে।

জঞ্জাল ও বর্জ্যে ভরাট নতুন ড্রেন: কেসিসির তথ্যমতে, নগরীতে নালার মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার। মেগা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অধিকাংশ নালাই ঢাকনাযুক্ত। কিন্তু এসব নালা পরিষ্কারের কোনো স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) ব্যবস্থা না থাকায় ম্যানুয়ালি টেনে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে হয়। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। বর্জ্য ও পলিথিন পড়ে অধিকাংশ নতুন ড্রেন ইতিমধ্যেই ভরাট হয়ে গেছে।

পাশাপাশি, প্রাকৃতিকভাবে পানি ধরে রাখার উৎস বা জলাশয়গুলোও হারিয়ে গেছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’ এবং কেডিএর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে একসময় ২৯৮টি জলাশয় ছিল, যার মধ্যে অন্তত ৮০টি জলাশয়ের এখন কোনো অস্তিত্বই নেই এবং ২৭টি আংশিক ভরাট হয়ে গেছে।

কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গেল কোথায়? খুলনা শহরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল। কেসিসি সূত্র জানায়, গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই শতাধিক নালা নির্মাণ এবং ময়ূর নদসহ সাতটি খাল খনন করা হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

এ বিষয়ে বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, “ময়ূর নদ খনন করা হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না করায় নদীর পাড়ে ফেলে রাখা মাটি আবার বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদীতেই ফিরে যাচ্ছে। আলুতলা গেট খুলে ময়ূর নদকে রূপসা নদীর সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা না গেলে এই পানি নিষ্কাশন সহজ হবে না।”

যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ: খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান জানান, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অনেক কাজ শেষ হলেও পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেট সংস্কারের মতো কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও বাকি রয়েছে। এই কাজগুলো শেষ হলে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে, কেসিসির বর্তমান প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু সংকটের গভীরতা স্বীকার করে বলেন, “অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে নগরের জলাবদ্ধতার মূল গভীরে কেউ যায়নি। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। গত সাড়ে তিন মাসে আমরা সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছি। চ্যালেঞ্জটা এমন যে, এখনই পূর্ণদমে কাজ শুরু করলেও তা শেষ করতে আরও এক থেকে দেড় বছর সময় লাগবে।”

যতদিন না এই অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধন হচ্ছে, ততদিন কোটি কোটি টাকার বাজেট কেবল কাগজে-কলমেই থাকবে, আর খুলনাবাসীকে ভুগতে হবে স্থায়ী জলজটলায়—এমনটাই মনে করছেন নগরীর সচেতন মহল।