ঢাকা অফিস
গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে এক যুগ আগে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে যে পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল, তার কিছু অংশ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি আপিল গতকাল বৃহস্পতিবার খারিজ করে রায় দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ।
এর ফলে দেড় বছর আগে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকছে বলে জানিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত ‘৫৮ক’ অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছিল। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা দিয়ে ‘৫৮ক’ অনুচ্ছেদটি বিলোপ করা হয়। হাইকোর্ট রায়ের একটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফলে তা বাতিল ঘোষণা করা হলো। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে ধারা দুটি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টের এই পর্যবক্ষণের কথা তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল।
পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট করা হয়, তখন হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা। এছাড়া সংবিধানে ৭ক, ৭খ বাতিলের রায়সহ আল্টিমেটলি হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল।’
যেভাবে আসে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের রায়: ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী আইন’ নামে পাস হয় এবং রাষ্ট্রপতি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তাতে অনুমোদন দেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান বাতিলের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়; সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয়। এছাড়াও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে দোষী করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও যুক্ত করা হয়। আগে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করার বিধান থাকলেও পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান যুক্ত করা হয়।
এসব সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। এই রিটে প্রাথমিক শুনানির পর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১ কেন অসাংবিধানিক এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে। পরে এই রুল সমর্থন করে ইন্টারভেনার (মধ্যস্ততাকারী সহযোগী) হিসেবে যুক্ত হন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দল হিসেবে যুক্ত করা হয় গণফোরাম এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব নামের একটি রাজনৈতিক দলকে। এছাড়া নওগাঁর বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনও এক পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। গত বছর ১৭ ডিসেম্বর দুটি রিটে একসঙ্গে রায় দেন উচ্চ আদালত। গত বছরের ৮ জুলাই ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।
এরপর গত বছর ৩ নভেম্বর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভটু আপিল) করেন চার রিট আবেদনকারী। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও লিভ টু আপিল করেন। ১৩ নভেম্বর এসব লিভটু আপিল মঞ্জুর করে তাঁদের আপিল করার অনুমিত দেন সর্বাচ্চ আদালত। পরে তাঁরা নিয়মিত আপিল করেন। এরপর শুরু হয় শুনানি। এসব আপিলে শুনানি চলার মধ্যে গত বছর ২ ডিসেম্বর বিএনিপির পক্ষে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে ইন্টারভেনার (মধ্যস্ততাকারী সহযোগী) হিসেবে যুক্ত হয় আরো দুইটি সংগঠন।
গত ৬ জুলাই তিনটি আপিলে শুনানি শুরু হয়। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া। এরপর শুনানি শুরু করেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আর ইন্টারভেনারদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক, এ এস এম শাহরিয়ার কবির ও আইনজীবী হামিদুল মিজবাহ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রুশদ হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ। গত বুধবার শেষ হলে বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত।
রায়ের পর রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই বছর আগে পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যে মামলা শুরু করেছিলাম, সর্বোচ্চ আদালত থেকে তার একটা পরিণীতি হলো। সেই কারণে দিনটিকে ঐতিহাসিক দিন বলে আমি মনে করি। হাইকোর্টের রায়টি আপিল বিভাগ কর্তৃক অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করার ফলেই কিন্তু দেশে একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়েছিল। আর এই কারণেই পঞ্চদশ সংশোধনীটা বাতিল হওয়া প্রয়োজন ছিল, যাতে বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা যায়। আপিল বিভাগ যদিও আমাদের আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। এর ফলে অর্থ যেটা দাঁড়িয়েছে যে, হাইকোর্টের রায় যেভাবে ছিল সেভাবেই বহাল থাকবে।’
আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় হুবুহু বহাল রাখায় সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ‘স্ববিরোধীতা’ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এই আইনজীবী। এর পক্ষে তাঁর যুক্তি হচ্ছে- ‘সংবিধানের ১২৩(৩ক) অনুচ্ছেদ (অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে পুনর্বহাল (ত্রয়োদশ সংশোধনী) হওয়া ‘৫৮ক’ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। তো এখন যদি প্রথম বিধানটা পরিপালন করা হয় তাহলে তো সংসদ ভেঙে যাওয়ার আগেই নির্বাচন করে ফেলতে হবে। তখন তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর সুযোগই থাকছে না। আর যদি সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পর তত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন করতে চান, তাহলে প্রথম যে অনুচ্ছেদটির কথা বললাম, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। ফলে একটা স্ববিরোধীতা তৈরি হয়েছে সংবিধানে। তো এই জিনিসটার সুরাহা সংসদেই করতে হবে বলেই মনে হচ্ছে।’
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে সংক্ষিপ্ত রায় দেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ওই বছর ১১ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান বাতিলসহ ৫৪ টি বিষয়ে সংশোদন এনে সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে আওয়ামী লীগ সরকার।











































