Home আঞ্চলিক নির্জনা হত্যাকাণ্ড: ‘অনার কিলিং’র জোরালো সন্দেহ, বাবা-মা এখনো পলাতক

নির্জনা হত্যাকাণ্ড: ‘অনার কিলিং’র জোরালো সন্দেহ, বাবা-মা এখনো পলাতক

711

২ বিয়ে ও চিঠির চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বাবা-মা পলাতক, বাড়িতে ঝুলছে তালা; তদন্তে সিআইডি

শামিম শিকদার ।।

খুলনা মহানগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া বস্তাবন্দী রক্তাক্ত মরদেহের পরিচয় মেলার পর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এখন চরম রহস্য ও চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে। নিহত কিশোরী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) নগরীর ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। সে সোনাডাঙ্গা মডেল থানার বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাসিন্দা মো. আলীম হোসেন আকাশের মেয়ে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই নির্জনার পিতা মো. আলীম হোসেন আকাশ এবং মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের বাড়িতে পুলিশ গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় পেয়েছে। হঠাৎ এই দম্পতির অন্তর্ধানের পর খোদ পুলিশের মনেই ‘অনার কিলিং’ বা লোকলজ্জার ভয়ে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের জোরালো সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ‘অনার কিলিং’র সন্দেহ: একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ধরে দিনকয়েক আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল স্কুলছাত্রী নির্জনা। আকাশ ও সীমা দম্পতি অনেক খোঁজাখুঁজির পর নির্জনাকে প্রেমিকের কাছ থেকে উদ্ধার করে বাসায় ফিরিয়ে আনেন।

কিন্তু বাসায় ফেরার পর থেকেই নির্জনা চরম বেসামাল ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করতে থাকে। এরপরই গত বুধবার রাতে তার বস্তাবন্দী রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার হয় এবং পরদিন থেকে তার বাবা-মা উধাও হয়ে যান। এই ঘটনার পর সচেতন মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে- এটি কি পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে ‘অনার কিলিং’ নাকি এর পেছনে প্রেমিকের কোনো হিংস্র থাবা রয়েছে?

মায়ের দাবি: নির্জনার ২টি বিয়ে হয়েছিল ও সাবেক স্বামীর ডেকে নেওয়া: পলাতক হওয়ার আগে বৃহস্পতিবার মর্গে গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা। তখন মর্গের সামনে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। সীমা জানান, “চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নির্জনা তেরখাদা উপজেলার পালেরহাট আজগরা গ্রামের আতিয়ার রহমানের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান রনির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। ১৭ দিন পর তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও ওই যুবক নির্জনার সাথে যোগাযোগ রাখত। রনিই কৌশলে নির্জনাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে মরদেহ ফেলে রেখে গেছে।”

তিনি আরও বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান যে, এর আগে ফকিরহাট উপজেলার বারইপাড়া এলাকার আরেক যুবকের সঙ্গেও নির্জনার বিয়ে হয়েছিল। তবে সেখানে মাত্র এক দিন থাকার পর সে বাবার বাড়িতে ফিরে আসে। মায়ের দাবি অনুযায়ী, বুধবার সকালে নির্জনা বাড়ি থেকে বের হলে তাকে ডেকে ফেরানো হয়, কিন্তু দুপুরে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকলে সবার অজান্তে সে আবার বের হয়ে যায়। আগে নির্জনা একটি চিঠিও লিখেছিল, যেখানে তাকে খোঁজাখুঁজি না করার কথা উল্লেখ ছিল।

পুলিশ যা বলছে: খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম শুক্রবার (১০ জুলাই) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “পরিবারের সদস্যরা মরদেহ শনাক্ত করার পর পুলিশ তাদের সোনাডাঙ্গার বাড়িতে গেলে সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পায়। এরপর থেকে বাবা-মায়ের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নির্জনাকে অন্য কোথাও নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে নিরালা প্রান্তিকা এলাকায় ফেলে রাখা হয়েছে। বাবা-মায়ের এই রহস্যজনক অনুপস্থিতিও তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।”

ওসি আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ইতিপূর্বেই বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং এই ঘটনার পেছনের মূল কুশীলবদের দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার করতে খুলনা থানা পুলিশের একাধিক টিম ও জেলা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) একযোগে মাঠে কাজ করছে। একটি উদীয়মান স্কুলছাত্রীকে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করে বস্তাবন্দী করার ঘটনায় গোটা খুলনা নগরীজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, নিস্তব্ধতা ও নিন্দার ঝড় বইছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।