শামিম শিকদার।।
তীব্র আর্থিক সংকটের অজুহাতে মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না খুলনা ওয়াসার (পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ) সাধারণ ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে যখন নিম্ন আয়ের কর্মীদের সংসার চালানোই দায়, ঠিক তখনই ওয়াসার সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপ ও বিলাসের পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। নিজেকে ‘রাজা’ জাহির করতে সরকারি খরচে সিংহাসন সদৃশ চেয়ার বানানো থেকে শুরু করে পৌনে ছয় লাখ টাকার টেলিভিশন ক্রয়-সব মিলিয়ে ওয়াসার এই আজব কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ খুলনার নাগরিক সমাজ।
এমডি কামরুজ্জামানের ‘বিলাসিতা’ ও লুটপাটের খতিয়ান: সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী এমডি মো. কামরুজ্জামান নিজের অফিস কক্ষ সাজানোর (রুম ডেকোরেশন) নামে তার পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে ৩০ লক্ষ টাকার সম্পূর্ণ ভুয়া ভাউচার করে পুরো টাকা আত্মসাৎ করেছেন। শুধু তাই নয়, ওয়াসার সরকারি তহবিল থেকে কেনা ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের ফুলদানি ও ওয়ালেট আর্টও (দেয়ালচিত্র) তিনি নিজের ব্যক্তিগত বাসায় নিয়ে গেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে নজর কেড়েছে তার বসার চেয়ারটি। নিজেকে রাজকীয় রূপে প্রকাশ করতে ওয়াসার অর্থ অপচয় করে তিনি একটি ‘সিংহাসন’ সদৃশ বিলাসবহুল চেয়ার তৈরি করিয়েছেন, যেখানে আরামের জন্য ব্যবহার করা হতো তিনটি বিশেষ বালিশ। এছাড়া তার কক্ষে একটি টেলিভিশন কেনা হয়েছে ৫ লক্ষ ৬৩ হাজার টাকায়, যা ভুয়া বিল-ভাউচারের চাতুরিতে পরবর্তীতে মোট ৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন ভুয়া বিলের মাধ্যমে তিনি কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ।
বকেয়া বেতনে কর্মচারীদের হাহাকার, ঘরে নেই চাল: যেখানে বড় বাবুদের বিলাসের জন্য কোটি টাকার তহবিল রাতারাতি জোগাড় হয়, সেখানে মাঠ পর্যায়ের লাইনম্যান, পাম্প অপারেটর এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের কপালে জুটেছে মাসের পর মাস বকেয়া বেতন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী কর্মচারী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন:
“আমাদের ঘরের চাল কেনার টাকা নেই। ধারদেনা আর এনজিওর কিস্তি চড়ায়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। ওয়াসার স্যার্থের কাছে গেলেই বলা হয় ‘তহবিল সংকট’। অথচ বড় বাবুরা লাখ লাখ টাকার টিভিতে বিনোদন নেন আর সিংহাসনে বসে ঘুমান। আমাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে এই বিলাসিতা কীভাবে চলে?”
পৌনে ৬ লাখ টাকার টিভি: সাধারণের চোখ চড়কগাছ: সাধারণ বাজারে যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির একটি ভালো মানের স্মার্ট টেলিভিশন ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে অনায়াসে পাওয়া যায়, সেখানে একটি সরকারি অফিসে শুধু টেলিভিশন দেখার জন্য কেন ৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা খরচ করতে হলো-তা নিয়ে খোদ ওয়াসার ভেতরেই কানাঘুষা চলছে। সচেতন মহলের মতে, এটি কোনো কেনাকাটা নয়, বরং কেনাকাটার আড়ালে সরাসরি সরকারি অর্থ লুটপাট।
‘প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা’, ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ: খুলনার সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলছেন, ওয়াসা একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান যা জনগণের ট্যাক্স এবং পানির বিলের টাকায় চলে। রাষ্ট্রের এই সংকটময় মুহূর্তে কর্মচারীদের না খাইয়ে একজন এমডির এমন ‘রাজকীয়’ জীবনযাপন ও অর্থ আত্মসাৎ চরম অমানবিক এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার নিকৃষ্ট উদাহরণ।
সদ্য বিদায়ী এমডি কামরুজ্জামানের বক্তব্য: খুলনা ওয়াসা থেকে সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন কোন ধরণের কেনাকাটার সাথে তিনি সম্পৃক্ত নয়। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম কেনাকাটা করেন।
খুলনা ওয়াসার এই বৈষম্যমূলক ও বিলাসী কেনাকাটা এবং বিদায়ী এমডির পাহাড়সম দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় তদন্ত এবং ভুক্তভোগী কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।









































