শামিম শিকদার||
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির বাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কাটতি থাকা পণ্যের নাম সম্ভবত ‘ইমেজ ক্লিনার’ বা ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কৃত্রিম পাউডার| রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ও ক্ষমতার পালাবদল যেদিকেই যাক না কেন, কিছু সুবিধাবাদী মহলের হাত ধরে এক অদ্ভুত ‘লন্ড্রি ব্যবসা’ শুরু হয়েছে| একসময় যাদের নাম শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ভয়, ক্ষোভ আর ঘৃণা জন্মাতো, আজ তারাই একদম নতুন মোড়কে জনসমক্ষে হাজির হওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে| দৃশ্যপট দেখে মনে হওয়া ¯^াভাবিক, দেশের কোথাও হয়তো একটি অদৃশ্য ও বিশালাকার ‘রাজনৈতিক ওয়াশিং মেশিন’ বসানো হয়েছে| যার প্রধান কাজই হলো—বিগত দিনের গণহত্যাকারী, দুর্নীতিবাজ এবং ˆ¯^রাচারের দোসরদের পেছনের সব অপকর্ম, অন্যায় আর রক্তের দাগ এক নিমিষে ধুয়ে-মুছে চকচকে সাদা বানিয়ে বাজারে ছেড়ে দেওয়া|
এই তথাকথিত রাজনৈতিক ওয়াশিং মেশিনের কার্যকারিতা ও জাদুকরী ক্ষমতা আসলেই পিলে চমকে দেওয়ার মতো| এখানে অপরাধীর কোনো আদর্শ লাগে না, নিজের কৃতকর্মের জন্য কোনো প্রকার আত্মসমালোচনা করতে হয় না, এমনকি দেশের জনগণের কাছে হাঁটু গেঁড়ে ক্ষমা চাওয়ার ন্যূনতম সৌজন্যতাবোধের প্রয়োজনও পড়ে না| ধোলাই প্রক্রিয়ার সমীকরণটি বড্ড সহজ—ভেতরে ভেতরে সামান্য কিছু সুযোগসন্ধানী লেনদেন, পর্দার আড়ালে কিছু অশুভ আঁতাত, আর ফ্রন্টলাইনে গুটিকয়েক সুবিধাবাদী ও চাটুকার মুখপাত্রের জোগাড় করা| ব্যস, এই সামান্য উপাদানেই কেল্লাফতে! বছরের পর বছর ধরে চালানো ক্ষমতার দম্ভ, সীমাহীন লুণ্ঠন, দমন-পীড়ন আর চরম গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড মুহূর্তের মধ্যেই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি’ কিংবা ‘ব্যক্তিগত ভুল’ হিসেবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়|

সবচেয়ে বিপজ্জনক ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই ধোলাই প্রক্রিয়ার আড়ালে কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ রাতারাতি নিজেদের ‘গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা’ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে| যারা বিগত ১৫ বছর যাবত ফ্যাসিবাদের সুশীতল ছায়ায় থেকে আখের গুছিয়েছে, সাধারণ মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে সজ্ঞানে নীরব থেকেছে কিংবা সরাসরি জুলুমের অংশীদার হয়েছে; আজ তারাই নতুন ভাষা ও চতুর তত্ত্বে পুরনো খুনি ও ফ্যাসিস্ট চরিত্রগুলোকে জনদরবারে নির্দোষ প্রমাণ করতে মরিয়া| পুরো বিষয়টি দেখে মনে হয়, রাজনীতি কোনো আদর্শিক বা ত্যাগের জায়গা নয়, বরং এটি কোনো নামিদামি বিউটি পার্লারের ‘মেকওভার প্যাকেজ’—যেখানে একটু মেকআপ আর লিপস্টিক ঘষলেই ভেতরের কদর্য রূপ ঢেকে ফেলা যায়|
আজকের এই ক্রান্তিকালে রাজনীতিতে ‘ইমেজ ম্যানেজমেন্ট’ বা কৃত্রিম ভাবমূর্তি ˆতরি করা যেন মূল রাজনৈতিক আদর্শের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে| একজন মানুষের অতীত কতটা কলঙ্কিত বা অপরাধমূলক ছিল, সেটি আর বিচার্য হচ্ছে না| বরং বর্তমানে তিনি কার সঙ্গে ˆবঠক করছেন, কার পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছেন, কিংবা কোন টকশোতে সুশীল সেজে কী বুকনি ছাড়ছেন—এসব দিয়েই তার নতুন পবিত্র পরিচয় রাতারাতি উৎপাদন করা হচ্ছে| এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কুশীলবরা হয়তো ধরে নিয়েছেন যে, এ দেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত দুর্বল এবং অল্প কিছু চটকদার স্লোগান আর কৃত্রিম আবেগের নাটক দেখালেই তারা পেছনের সব নির্মমতা ভুলে যাবে| জুলাই-আগস্টের রাজপথের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই যারা এই দুঃসাহস দেখায়, তাদের জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে|
রাজনীতির এই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলায় সবচেয়ে দক্ষ ও পারদর্শী মূলত তারাই, যারা বাতাস বুঝে দ্রুত গায়ের রং বদলাতে পারে| ক্ষমতার সুবাতাস যখন যেদিকে প্রবাহিত হয়, নীতিহীন এই গিরগিটিরা অত্যন্ত নিপুণভাবে সেদিকেই নিজেদের আদর্শের পাল তুলে দেয়| গতকাল পর্যন্ত যারা ফ্যাসিবাদের বলয়ে থেকে ক্ষমতার হালুয়া-রুটি ভাগাভাগি করেছে, আজ তারাই রাজপথে নতুন ব্যানারে ‘গণতন্ত্রের পাহারাদার’ সেজে বসেছে| আবার ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে আগামীকাল অন্য কোনো পতাকার নিচে গিয়ে দাঁড়াতেও এদের বিবেক একটুও কাঁপবে না|
কিন্তু এই ধরনের সস্তা ও জোরপূর্বক রাজনৈতিক পুনর্বাসন কেবল এক বা একাধিক ব্যক্তির চরিত্র ধোলাই করে না; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটি চরম আত্মঘাতী ও ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়| এই নোংরা সংস্কৃতির কারণে তরুণ প্রজন্ম ভুল শিক্ষা পায়| তারা শেখে—এ দেশে অপরাধ, দেদারসে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা ˆ¯^রাচারী শাসন চালানো কোনো বড় সমস্যাই নয়, যদি সময়মতো কোনো প্রভাবশালী গডফাদারের ডানা বা রাজনৈতিক ওয়াশিং মেশিনের আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যায়| এর ফলে দেশের রাজনীতিতে নীতিহীনতা ও সুবিধাবাদ পুরস্কৃত হয়, আর আজীবন নীতি আঁকড়ে থাকা ত্যাগী ও প্রকৃত আদর্শবান মানুষরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে সমাজ থেকে হারিয়ে যায়|
একটি ¯^াধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন অবশ্যই কাম্য| মানুষ ভুল করতেই পারে এবং তাদের সংশোধনের সুযোগও থাকা উচিত| কিন্তু ‘সংশোধন’ আর ‘ওয়াশিং মেশিনের ধোলাই’ কখনো এক জিনিস হতে পারে না| সত্যিকারের রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা, প্রকাশ্য আত্মসমালোচনা এবং জনগণের কাছে গিয়ে আস্থার পুনর্গঠন করা| শুধু মোড়ক বা পোশাক বদলালেই ভেতরের ˆপশাচিক চরিত্র বদলে যায় না|
যেমনটা প্রচলিত কথায় বলা হয়—বোতল নতুন হতে পারে, তার গায়ে লাগানো লেবেলটাও একদম ঝকঝকে নতুন হতে পারে; কিন্তু ভেতরের পুরনো তেঁতুলের জল যদি একই থাকে, তবে তার টক ও তেতো ¯^াদও একই থাকবে| ক্ষমতার অলিন্দে থাকা কুশীলবদের মনে রাখা উচিত, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন| তারা শুধু বাইরের মেকি মুখটাই দেখে না, মুখোশের ভেতরের আসল ফ্যাসিবাদের কুৎসিত চেহারাটাও স্পষ্ট চিনে নিতে শিখে গেছে| তাই ক্ষমতার লোভ আর আঁতাত দিয়ে ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের যেকোনো অপচেষ্টা এ দেশের সচেতন জনতা রুখবেই| লেখক: গণমাধ্যমকর্মী











































