Home Lead পরিচ্ছন্নতা অভিযানে স্থবিরতা, খুলনা অঞ্চলে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

পরিচ্ছন্নতা অভিযানে স্থবিরতা, খুলনা অঞ্চলে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

35
বানরগাতি বাজার মেটেপোল ও ইসলামাবাদ কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজের সামনে থেকে ছবি তোলা--খুলনাঞ্চল


শামিম শিকদার।।


উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নিয়মিত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা না থাকায় এবার বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে| বিশেষ করে প্রতি শনিবার ডেঙ্গু প্রতিরোধে সারাদেশে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকলেও খুলনা অঞ্চলে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না| ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নাগরিক নেতারা যেমন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তেমনি মশার উপদ্রবে অস্থির হয়ে উঠেছেন|


চলতি বছরের গত ১১ মার্চ বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় প্রতি শনিবার সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার কথা জানানো হয়| একই বিষয়ে পৃথক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান| বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়| বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ১৪ মার্চ থেকে প্রতি সপ্তাহের শনিবার সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়| তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতৃত্বকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান| তবে বাস্তবে খুলনায় সেই নির্দেশনার প্রতিফলন খুব একটা চোখে পড়ছে না|


স্থানীয়রা জানান, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) শুরুতে কয়েক দফা পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করলেও অন্যান্য জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা এখন আর তেমন চোখে পড়ে না| বিশেষ করে জেলা ও আশপাশ এলাকায় তৎপরতা নেই বললেই চলে|


নগরীর অনেক এলাকার ড্রেন, খাল ও আবাসিক এলাকার আশপাশে এখনো জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও স্থির পানি, যা ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে|


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই হাজার ৮১০ জন| রোগটিতে মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের| এর মধ্যে ঢাকার দুই উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬৮৮ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪০৮ জন, বরিশালে ৬৩৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৪৭ জন, খুলনায় ১৭৩ জন, রাজশাহীতে ১১৫ জন, ময়মনসিংহে ৪৯ জন, রংপুরে ২৮ ও সিলেট বিভাগে ২৫ জন|


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, গাজিপুর ও চাঁদপুর জেলায়ও রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে| হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ২২ শতাংশ মিলছে এই পাঁচ জেলায়|


সূত্রটি বলেছে, ডেঙ্গু পরিস্থিতির আগাম ধারণা নিতে প্রতিবছর তিন দফায় এডিস মশার জরিপ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা| বর্ষার আগে, বর্ষার সময় ও পরে| এতে এডিস মশার ঘনত্ব দেখে আগাম ধারণা পাওয়া যায়, ডেঙ্গুর প্রকোপ কতটুকু হবে| দুই বছর ধরে এই জরিপ বন্ধ রয়েছে|


ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতির জন্য এই জরিপ খুবই প্রয়োজন মনে করেন জন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদরা| তাঁরা বলছেন, এতে মশার প্রকৃত পরিস্থিতি না জেনেই মশা নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে|
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম” এই নীতিকে কার্যকর করতে হলে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে| নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণই পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে|


নগরীর বাগমারা এলাকার শাহ আলম, ইয়াসিন আরাফাত, সোনাডাঙা এলাকার সাদ আহমেদসহ অন্যরা বলেন, নির্দেশনা শুধুমাত্র ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ও সম্বনিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি| অন্যথায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগের কোনো সুফল মিলবে না|


খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান কনজারভেন্সি কর্মকর্তা মোঃ আনিসুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক শনিবার ধরে বিশেষ কিছু কাজ থাকায় ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে শনিবারের বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি| বিশেষ করে গত শুক্রবার ও শনিবার শলুয়া স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শন এবং আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের প্রস্তুতির কারণে প্রশাসকদের নিয়ে এই অভিযানে নামা সম্ভব হয়নি| তবে বিশেষ অভিযানের চেয়েও সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ নিয়মিতভাবে আরও বেশি করা হয়েছে|”


তবে সিটি করপোরেশনের এমন যুক্তির তীব্র সমালোচনা করে খুলনা অঞ্চলের বিশিষ্ট নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “সরকারপ্রধানের নির্দেশনা অমান্য করা এক ধরনের অপরাধ| আমরা প্রতিবছরই দেখি ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে কেসিসির এক ধরনের দায়সারা কার্যক্রম চলে| মশক নিধনের ওষুধ সংগ্রহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম-সবকিছুতেই সব সময় একটা উদাসীন ভাব লক্ষ্য করা যায়| এর পেছনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে| ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত না থাকলে অভিযান চলবে না, এমন অজুহাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়| জনস্বার্থ রক্ষায় এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়মিত পরিচালনা করা উচিত|”


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবাহিত রোগবিষয়ক গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার গণমাধ্যমে বলেন, “আমাদের সাম্প্রতিক মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় আরো অনেক বেশি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে| লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের মাপকাঠি ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ বর্তমানে ঢাকার প্রায় কোনো এলাকায়ই ২০-এর নিচে নেই| কোনো কোনো জায়গায় এই ইনডেক্স সর্বোচ্চ ৯৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা জন¯^াস্থ্যের জন্য চরম এক সতর্কবার্তা| ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর ওপরে থাকলেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়|”


করণীয় প্রসঙ্গে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা অনুযায়ী, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে| হাতে থাকা আগামী দুই মাস আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| এই সময়ে কমিউনিটি মোবিলাইজেশন করা| অর্থাৎ লার্ভা নিধনে পাড়ায় পাড়ায় জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে হবে| লার্ভিসাইড প্রয়োগ; মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে কার্যকরভাবে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে| বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন : প্রতিটি বাসায় গিয়ে লার্ভা আছে কি না তা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে| কীটনাশকের পর্যাপ্ততা : সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রয়োজনীয় কীটনাশকের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে|’