খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কেবিএস (খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা) প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। অথচ প্রকল্পের আওতায় থাকা বহু সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও অন্যান্য উন্নয়নকাজ এখনো অসম্পূর্ণ। ফলে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ঠিকাদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
এ পরিস্থিতিতে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে বাস্তব তথ্য গোপন, একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনপ্রতিনিধি ও মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের মতামত উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মেয়াদ না বাড়িয়ে প্রকল্প সমাপ্ত করা হলে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে এবং জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালে অনুমোদন পায় কেবিএস প্রকল্প। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে এক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেই বর্ধিত মেয়াদও শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ৩০ জুন।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, তিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও অসংখ্য সড়ক, সেতু ও কালভার্টের কাজ চলমান রয়েছে। কোথাও সড়ক খনন করে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও সেতুর কাজ অর্ধেক অবস্থায় আছে, আবার কোথাও নির্মাণসামগ্রী ফেলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে এসব কাজ শেষ না হলে যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প পরিচালক পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি সভায় মাত্র ১৬টি চলমান স্কিমের তথ্য উপস্থাপন করেছেন এবং দাবি করেছেন, জুনের মধ্যেই সেগুলোর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা, এই তিন জেলায় প্রায় শতাধিক স্কিম এখনও চলমান রয়েছে।
খুলনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, তার জেলার অন্তত ১৩টি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয়। একইভাবে সাতক্ষীরা নির্বাহী প্রকৌশলী প্রায় অর্ধশতাধিক চলমান স্কিমের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। বাগেরহাট থেকেও একই ধরনের প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের এসব বাস্তবভিত্তিক তথ্য উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালক সীমিত তথ্য উপস্থাপন করেছেন। এতে প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্প পরিচালক প্রায় সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিচ্ছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী, জনপ্রতিনিধি কিংবা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
এক কর্মকর্তা বলেন, মাঠের বাস্তবতা একরকম, কিন্তু উপস্থাপন করা হচ্ছে ভিন্ন তথ্য। এতে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। অনেক স্কিমে কাজের গতি কমে গেছে।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালক মেয়াদ বৃদ্ধি না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এখন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা চরম চাপের মধ্যে কাজ করছেন।
চলমান কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইজ্জত উল্ল্যাহ প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো এক আধা-সরকারি (ডিও) পত্রে চলমান স্কিমগুলো সম্পন্ন করতে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
একই ধরনের পত্র দিয়েছেন খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্যও। তাদের বক্তব্য, অসম্পূর্ণ কাজ রেখে প্রকল্প শেষ করা হলে জনগণ প্রত্যাশিত সুফল পাবে না এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়বে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদ সদস্যদের পাঠানো এসব পত্র প্রধান প্রকৌশলী পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক এসব সুপারিশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও তার মধ্যে ২০ কোটি টাকা প্রকল্প পরিচালকের নিজ জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এতে চলমান স্কিমগুলো বাস্তবায়নে অর্থসংকট আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চলমান স্কিমের একাধিক ঠিকাদার বলেন, তারা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, ‘সময়ের তুলনায় কাজ অনেক বেশি বাকি। কাজ শেষ না হলেও বিল, অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি। প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে গেলেই নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।’
আরেক ঠিকাদার বলেন, ‘অনেক জায়গায় অতিরিক্ত শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজের গতি বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত অল্প সময়ে মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।’
সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল হাসান বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো, আমাদের জেলায় এখনও অনেক স্কিমের কাজ চলমান রয়েছে। মেয়াদ বৃদ্ধি না হলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলীও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, অনেক প্রকল্পের কাজ এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাকি রয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় সময় না বাড়ালে কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমি এখানে থাকতে চাই না। প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।’
প্রকল্পে অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং চলমান স্কিমের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।











































