মিলি রহমান।।
সুস্থ জীবনের জন্য কেবল স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং কোন খাবারগুলো লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করছে তা জেনে খাবারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে বর্তমানে ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’—যা পূর্বে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার নামে পরিচিত ছিল—তার প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে প্রদাহ এবং টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই রোগটি দেখা দেয়। সময়মতো এর চিকিৎসা না হলে লিভারে স্থায়ী ক্ষত বা ‘ফাইব্রোসিস’ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ‘সিরোসিস’-এর মতো মারাত্মক পর্যায়ে রূপ নেয়।
অনেক সময় রোগীকে বাঁচাতে লিভার প্রতিস্থাপনেরও প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগ অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নয়, বরং স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে বেশি ছড়ায়।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা এমন ৬টি খাবারের তালিকা তৈরি করেছেন, যা লিভারে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। একই সঙ্গে এগুলো পরিহার করার জন্য কিছু চমৎকার বিকল্পও উল্লেখ করেছেন।
লিভারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৬টি খাবার এবং এর বৈজ্ঞানিক প্রভাব-
১. ফাস্টফুড
ফাস্টফুডে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ফ্রুক্টোজ থাকে। সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির লিভার বিশেষজ্ঞ ড. অ্যানি কারদাশিয়ান জানান, ‘এই চর্বি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লিভারের ক্ষতি করে সিরোসিস ডেকে আনে।’
২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দৈনিক ক্যালরির অন্তত ২০ শতাংশ ফাস্টফুড থেকে গ্রহণ করেন, তাদের লিভারে চর্বির পরিমাণ সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি। চিকিৎসকদের মতে, দিনে মাত্র একটি ফাস্ট ফুড মিল-ও লিভারের ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট।
২. লাল মাংস বা রেড মিট
শিকাগো ইউনিভার্সিটির লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ডায়েটিশিয়ান অ্যানি গুইনানের মতে, গরুর মাংসের বার্গারের চেয়ে মুরগি বা টার্কির বার্গার লিভারের জন্য অনেক নিরাপদ। রেড মিটে থাকা উচ্চ স্যাচুরেটেড ফ্যাট লিভারে মৃদু কিন্তু স্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে।
২০২২ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণে (নারীদের জন্য ৮৮ গ্রাম এবং পুরুষদের জন্য ১২৩ গ্রাম) রেড মিট বা প্রক্রিয়াজাত মাংস (যেমন ব্যাকন) খেলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি দ্বিগুণ এবং ফাইব্রোসিসের ঝুঁকি চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
৩. অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার
লবণ লিভারে প্রদাহ তৈরি করে। বিশেষ করে যাদের লিভারের রোগটি ইতোমধ্যেই জটিল পর্যায়ে (সিরোসিস) পৌঁছেছে, তাদের জন্য লবণ বিষের মতো। এটি শরীরে পানি জমায়, যা পরবর্তীতে কিডনি বিকল হওয়া এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার ফলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয় এবং সিরোসিস রোগীদের অকাল মৃত্যুর আশঙ্কাও দ্বিগুণ হয়ে যায়।
৪. ভাজাপোড়া খাবার
ডিপ-ফ্রাই বা ডুবো তেলে ভাজা খাবারে থাকা ক্ষতিকর ফ্যাট লিভারের টিস্যু ধ্বংস করে।
২০২০ সালের একটি স্বাস্থ্য সমীক্ষা বলছে, সপ্তাহে মাত্র দুই দিন ভাজাপোড়া খাবার খেলে লিভারের রোগের ঝুঁকি দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। এমনকি এই ঝুঁকি স্থূলতা বা মেদ বৃদ্ধির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।
৫. কোমল পানীয় ও চিনিযুক্ত পানীয়
কার্বোনেটেড ড্রিংকসে উচ্চ মাত্রায় ফ্রুক্টোজ এবং হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ থাকে, যা সরাসরি লিভারে চর্বি হিসেবে জমা হয়। ২০২৩ সালের ‘জামা’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে অন্তত একবার চিনিযুক্ত পানীয় পান করেন, তাদের লিভারের রোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেশি।
৬. আল্ট্রা-প্রসেসড বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার
প্যাকেটজাত বেকড খাবার, চিপস, মিষ্টি সিরিয়াল কিংবা মাইক্রোওয়েভে গরম করে খাওয়ার উপযোগী তৈরি খাবারে কৃত্রিম রাসায়নিক, স্টার্চ, অতিরিক্ত চিনি ও লবণ থাকে। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এই ধরনের খাবার বেশি খান, তাদের ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৪২ শতাংশ বেশি।
চিকিৎসকদের পরামর্শ: সুস্থ লিভারের জন্য সহজ কিছু বিকল্প
পুষ্টিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা খাবার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার চেয়ে সচেতনভাবে বিকল্প বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
মাংসের বিকল্প: খাদ্যতালিকা থেকে রেড মিট কমিয়ে তা প্রতি মাসে ১-২ বারে নামিয়ে আনুন। এর বদলে প্রোটিনের উৎস হিসেবে মুরগি, টার্কি বা মাছ বেছে নিন। ফাস্টফুড খেতেই হলে গ্রিলড চিকেন বা সবজি ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
তেলের বিকল্প: রান্নায় সাধারণ তেলের পরিবর্তে ‘এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল’ ব্যবহার করুন। এতে থাকা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট লিভারকে সুরক্ষা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনে।
পানীয়ের বিকল্প: ফলের জুস বা সোডা বাদ দিয়ে প্রচুর পানি পান করুন। কার্বোনেশনের তৃষ্ণা মেটাতে জিরো-ক্যালরি ফ্লেভারড ওয়াটার বা মাঝেমধ্যে ডায়েট সোডা খাওয়া যেতে পারে।
স্ন্যাক্সের বিকল্প: প্যাকেটজাত চিপস বা সল্টেড বাদামের পরিবর্তে লবণ ছাড়া সাধারণ বাদাম খাওয়ার অভ্যাস করুন। বাজারে কেনাকাটার সময় প্যাকেটের লেবেল দেখে কম উপাদান ও কম সোডিয়ামযুক্ত খাবার কিনুন।











































