মোস্তফা জামাল পপলু।।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট একসময় দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। নদী, খাল-বিল ও বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যের কারণে এ অঞ্চল দেশের অভ্যন্তরীণ মাছের চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ পূরণ করত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে বর্তমানে এই অঞ্চলের নদ-নদীতে ভয়াবহ হারে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, এই লবণাক্ততা এখন দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যসম্পদের জন্য এক “নীরব ঘাতক” হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী ও খালে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কেবল মাছের উৎপাদন কমছে না, বরং বহু দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং পুরো উপকূলীয় অর্থনীতি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও সৌদি আরবের কিং ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত লবণাক্ততা মাছের শারীরিক বৃদ্ধি, প্রজননক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমনকি কিছু মাছের ডিএনএ গঠনেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশীয় মৎস্যসম্পদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে খুলনা ও সাতক্ষীরার কপোতাক্ষ, রূপসা ও শিবসা নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা ২০ থেকে ২৫ পিপিটি পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। যা বহু মিঠাপানির মাছের জন্য সহনীয় সীমার অনেক ওপরে।
একসময় দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও খালে ব্যাপক হারে পাওয়া যেত গুলশা, ট্যাংরা, খলিশা, পুঁটি, সরপুঁটি, রানী মাছসহ অসংখ্য দেশীয় প্রজাতি। এখন এসব মাছ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০ পিপিটি লবণাক্ততায় গুলশা মাছের বেঁচে থাকার হার ৯৮ শতাংশ থেকে কমে ৮৭ শতাংশে নেমে আসে। শুধু তাই নয়, মাছের লেজের দৈর্ঘ্য, শরীরের স্বাভাবিক গঠন এবং উজ্জ্বলতাও কমে যায়, যার ফলে বাজারমূল্য হ্রাস পাচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে দক্ষিণাঞ্চলের উন্মুক্ত জলাশয়ে মিঠাপানির মাছের উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমেছে। একসময় এ অঞ্চলে রুই, কাতলা, মৃগেল, আইড়, পাবদা, রিটা ও বাঘাইড় মাছের ব্যাপক প্রাচুর্য থাকলেও বর্তমানে এসব মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অন্তত ৩০টির বেশি দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিলে-বাওড়ে লোনা পানি প্রবেশ করায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাছের পোনা নষ্ট হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, কেবল দক্ষিণাঞ্চলেই বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মৎস্যসম্পদের এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়ের ওপর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় আড়াই লাখ নিবন্ধিত জেলের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বর্তমানে সাময়িক বেকারত্বের মুখে পড়েছেন। গত পাঁচ বছরে খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ মৎস্যজীবী বাধ্য হয়ে তাদের বংশপরম্পরার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছ আহরণ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। মাছভিত্তিক ব্যবসা, পরিবহন, বরফকল, আড়ত ও স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাছের সংকটের কারণে উপকূলীয় মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। মাছ বাঙালির আমিষের প্রধান উৎস। কিন্তু মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে দামও বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। বিবিএস-এর “খানার আয় ও ব্যয় জরিপ” অনুযায়ী, গত তিন বছরে উপকূলীয় অঞ্চলে মাছের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের আমিষ গ্রহণের পরিমাণ দিনে ৫২ গ্রাম থেকে কমে ৩৮ গ্রামে নেমে এসেছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশু ও নারীদের ওপর। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে শিশুদের খর্বাকৃতি হওয়ার প্রবণতা এবং গর্ভবতী নারীদের রক্তস্বল্পতার হার জাতীয় গড়ের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পুষ্টিহীনতার কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সামাজিক ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা। আয় কমে যাওয়ায় অনেক জেলে দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ছেন। উপকূলীয় নারীরা, যারা একসময় নদী থেকে মাছের রেণু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারাও এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে অনেক পরিবার চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও গবেষকরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, দ্রুত লবণাক্ততা সহনশীল মাছের জাত উদ্ভাবন, নদী খননের মাধ্যমে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, স্লুইস গেট ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
তারা আরও বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণাঞ্চল ভয়াবহ আর্থসামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।











































