Home Lead মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে ইসলামি দলগুলোর নারী শাখা

মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে ইসলামি দলগুলোর নারী শাখা

8


ঢাকা অফিস
দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসলামি দলগুলোর নারী বিভাগ| জোটবদ্ধভাবে মাঠের আন্দোলন ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে| এই প্রেক্ষাপটে দলগুলোর নারী উইং বা নারী শাখার তৎপরতাও বাড়তে শুরু করেছে| রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ও নারীর অধিকার আদায়ে কাজ করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দলগুলো জানিয়েছে| বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে তাদের শক্তিশালী নারী উইংয়ের মাধ্যমে সংগঠিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে| পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি দলও তাদের মহিলা বিভাগকে পুনর্গঠন ও সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে| কোথাও কোথাও আলাদা ছাত্রী উইং গঠনের প্রস্তুতিও চলছে|


বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী শাখা পুনর্গঠন: দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নারী কার্যক্রম নতুন করে সংগঠিত করতে যাচ্ছে আল্লামা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস| শুক্রবার (১৫ মে) ঢাকায় দলের আমির মাওলানা মামুনুল হকের বাসায় এ বিষয়ে প্রথম ˆবঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে| দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের মাধ্যমে তালিম ও ধর্মীয় কার্যক্রম চললেও তা দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে ছিল না| নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম কেন্দ্রীয় সংগঠনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে| দলের দায়িত্বশীলরা জানান, আগে ‘মহিলা মজলিস’ নামে যে কাঠামো ছিল, তা প্রায় ২০ু২৫ বছর আগে থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়| এবার তা পুনরায় সক্রিয় করে দলীয় কাঠামোর মধ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে|
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমš^য়ক হাসান জুনায়েদ বলেন, ‘আমরা এখন এটিকে ‘নারী শাখা’ হিসেবে সংগঠিত করছি|

এতদিন এটি অনানুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন এলাকায় আলাদা উদ্যোগে চলছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় কোনো কাঠামো ছিল না|’ তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের মাধ্যমে তালিম ও ধর্মীয় কার্যক্রম চললেও তা দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে ছিল না| নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয় সংগঠনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে|
দলীয় সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে শুক্রবারের ˆবঠকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না-ও হতে পারে| তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দুই থেকে তিনজন দায়িত্বশীলকে সমš^য়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে| এক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ১১ দল মনোনীত সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মাহবুবা হাকিম নেতৃত্বে আসতে পারেন বলে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন| হাসান জুনায়েদ আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সফর ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে নারী শাখার সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে| দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে সংগঠন বিভক্ত হওয়ার পর আগের ‘মহিলা মজলিস’ কার্যক্রম আর এককভাবে চালু ছিল না| বর্তমান উদ্যোগকে সংগঠন পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে|


জামায়াতের মহিলা বিভাগ ও ছাত্রী সংস্থা: জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মহিলা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দলের মোট কর্মী সংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ নারী| নারী শাখার সদস্য কাঠামো তিন স্তরে বিভক্ত—সহযোগী সদস্য, কর্মী ও রুকন| এর মধ্যে রুকন সর্বোচ্চ স্তর| দলীয় তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় অর্ধলাখ নারী রুকন (সদস্য) এবং প্রায় চার লাখ কর্মী নারী শাখায় যুক্ত রয়েছেন| সারাদেশে রয়েছে অসংখ্য সহযোগী সদস্য|


ছাত্রী সংস্থায় প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ নেতা-কর্মী রয়েছে| ছাত্রী সংস্থা ফ্যাসিস্ট আমলে নানা নির্যাতন ও মামলা-হামলার শিকার হয়েছে| পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে তা কম নয়| তবুও আমাদের ছাত্রীরা কাজ করে গেছে| তারা এখন ¯^াধীনভাবে কাজ করছে| দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি রয়েছে| জেলা ও উপজেলা শহরেও কমিটি রয়েছে| জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ জানায়, নির্বাচনী রাজনীতিতেও নারী বিভাগের অংশগ্রহণ রয়েছে| ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে ৩৬ জন নারী ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন| ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ জন| এছাড়া ২০০১-২০০৫ মেয়াদে চারজন এবং ১৯৯১-১৯৯৫ মেয়াদে দুজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ছিলেন| সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে দলটির আটজন নারী মনোনীত হয়েছেন|


জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দিকা বলেন, ছাত্রী সংস্থায় প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ নেতা-কর্মী রয়েছে| ছাত্রী সংস্থা ফ্যাসিস্ট আমলে নানা নির্যাতন ও মামলা-হামলার শিকার হয়েছে| পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে তা কম নয়| তবুও আমাদের ছাত্রীরা কাজ করে গেছে| তারা এখন ¯^াধীনভাবে কাজ করছে| দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি রয়েছে| জেলা ও উপজেলা শহরেও কমিটি রয়েছে|


ইসলামী আন্দোলনের ‘ছাত্রী উইং’: অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাংগঠনিক বিস্তার ও নারী ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ| দলটি আলাদা ‘ছাত্রী উইং’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ঈদুল আজহার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারে| ছাত্রী সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং তাদের উপযোগী করে কর্মসূচি উপস্থাপন করা| এর মাধ্যমে সংগঠনের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি নারী নেতৃত্ব ˆতরির সুযোগ সৃষ্টি হবে| ইসলামী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য|


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নারী বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পর থেকে কমিটি গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে| দলটি তাদের নারী কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে| তবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ ও কার্যক্রমে কিছুটা ‘জেনারেশন গ্যাপ’ ˆতরি হওয়ায় এবার আলাদা ছাত্রী সংগঠন গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি| এ বিষয়ে নেতারা জানিয়েছেন, প্রচলিত নাম পরিবর্তন করে এটি ‘ছাত্রী আন্দোলন’ নামে কার্যক্রম চালানোর চিন্তা করা হচ্ছে|


ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক ফজলুল করিম মারুফ বলেন, এই ছাত্রী সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং তাদের উপযোগী করে কর্মসূচি উপস্থাপন করা| এর মাধ্যমে সংগঠনের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি নারী নেতৃত্ব ˆতরির সুযোগ সৃষ্টি হবে|


বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন: বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানী বলেন, খেলাফত আন্দোলনের মহিলা বিভাগ রয়েছে, তবে সেটি খুব শক্তিশালী বা সুসংগঠিত অবস্থায় নেই| আমাদের দল তেমন সরব নয়, নারী বিভাগ নিয়ে| তবে কিছু কিছু জায়গায় কমিটি রয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু কার্যক্রমও আছে, যদিও সার্বিকভাবে তা খুব শক্তিশালী নয়| তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়েও একটি কাঠামো রয়েছে|

সেখানে আমাদের দলের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদীর স্ত্রী দায়িত্বে আছেন| প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে মহিলাদের জন্য বাংলাদেশ ইসলামী মহিলা মজলিস রয়েছে বলে জানিয়েছে খেলাফত মজলিস| এছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী মজলিস নামেও সংগঠন রয়েছে| দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও তথ্য সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুল হাফিজ খসরু বলেন, সংগঠনের নিজ¯^ গঠনতন্ত্র ও কার্যপ্রণালি আছে| সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে| মহিলাদের আলাদা ইউনিট আছে| আমাদের কেন্দ্রীয় খেলাফত মজলিসে নির্বাহী পরিষদে মহিলাদের দুইজন মে¤^ার আছে| মহিলা মজলিস নারীদের মাঝে কোরআন হাদিসের পাঠদান, ব্যক্তিগত আমল নিয়ে কাজ করেন| এছাড়া নারী অধিকার বিষয়ক প্রোগ্রাম করেন| ফ্যাসিবাদী আমলে হিজাব ইস্যুতে রাস্তায় প্রতিবাদ করেছেন|

তিনি বলেন, মহিলাদের সংগঠন দেখার জন্য আমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে একজন নায়েবে আমির এই মহিলা বিভাগ দায়িত্বে আছেন| তিনি কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত্বাবধান করেন|


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি ইসলামি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম এবং নির্বাচনী অংশগ্রহণ তাদের সংগঠন কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার চাপ ˆতরি করেছে| এর অংশ হিসেবেই নারী উইংগুলোকে নতুনভাবে সক্রিয় করা হচ্ছে|