Home আঞ্চলিক কেডিএ-র ‘সাংস্কৃতিক ফতোয়া’: গান-বাজনা অসামাজিক কর্মকাণ্ড !

কেডিএ-র ‘সাংস্কৃতিক ফতোয়া’: গান-বাজনা অসামাজিক কর্মকাণ্ড !

70

আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু।।

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)-র নামের সাথেই জড়িয়ে আছে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি। কিন্তু উন্নয়ন বলতে তারা আসলে কী বোঝেন? এটি এখন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল ইট-পাথরের জঙ্গল, কংক্রিটের ভবন আর প্রশস্ত রাস্তা কি উন্নয়ন? এই প্রশ্নের উত্তর হলো- “না”। একটি জনপদের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই ঘটে, যখন তার অধিবাসীদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। কিন্তু সম্প্রতি কেডিএ সংগীতকে ‘অসামাজিক’ হিসেবে অভিহিত করে এক ধরনের ‘ফতোয়া’ জারি করেছে। সংগীত যেখানে মানুষের রুচিকে মার্জিত করে এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, তাকে ‘অসামাজিক’ কাজের তালিকায় ফেলে দেওয়া কি সভ্যতার লক্ষণ, নাকি মধ্যযুগীয় আদিমতার বহিঃপ্রকাশ?
কেডিএ-র নীতিনির্ধারকরা হয়তো ভুলে গেছেন যে, এই জনপদের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম আর জাতিসত্তার বিকাশে সংগীতই ছিল প্রধান হাতিয়ার। তারা আজ সেই সংস্কৃতিকেই অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। সামাজিক ও আইনি পরিভাষায় ‘অসামাজিক কাজ’ বলতে মাদক ব্যবসা, নারী নির্যাতন বা চোরাচালানের মতো অপরাধকে বোঝানো হয়। কিন্তু সংগীত কীভাবে অসামাজিক কাজ হতে পারে, তা বোধগম্য নয়।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম উন্মুক্ত স্থানে গান গাইতে চায়—এটি কোনো অপরাধ নয়। অথচ কেডিএ নিউ মার্কেটের খোলা জায়গায় গান-বাজনাকে ‘অসামাজিক’ আখ্যা দিয়ে ব্যানার টাঙিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা কেবল ভুলই করেনি, বরং এটি একটি ‘ভাষাগত সন্ত্রাস’। গান-বাজনাকে সরাসরি ‘অসামাজিক’ বলে চিহ্নিত করা একটি বিদ্বেষমূলক প্রচারণা। নাগরিকদের সুস্থ বিনোদনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি কেডিএ-র নেই। প্রতিষ্ঠানের সরকারি লোগো ব্যবহার করে এমন পশ্চাদপদ এবং উগ্র ভাবাদর্শের বার্তা প্রচার করা কি রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা?

বর্তমানে যখন বিশ্বব্যাপী মৌলবাদ ও অসহিষ্ণুতা একটি বড় ঝুঁকি, তখন কেডিএ-র মতো প্রতিষ্ঠানের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহিত করে। যারা মনে করে শিল্প-সংস্কৃতি পাপ বা বর্জনীয়, কেডিএ-র এই ব্যানার তাদের সেই ভ্রান্ত ধারণাকে সরকারি সিলমোহর দিয়ে বৈধতা দিচ্ছে। এটি সমাজকে আরও মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাবে এবং মুক্তমনা মানুষের পথ সংকুচিত করবে। সংগীতকে অসামাজিক বলা মানে হলো মানুষের সৃজনশীলতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।

খুলনা অঞ্চল তার লোকজ গান ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য সুপরিচিত। এমন একটি জনপদে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর এক নগ্ন হস্তক্ষেপ। এটি খুলনাবাসীর রুচি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে চরমভাবে অপমান করার শামিল। কেডিএ কি চায় খুলনার তরুণ প্রজন্ম সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে মাদক বা অপরাধের পথে পা বাড়াক? কারণ সুস্থ বিনোদনের পথ বন্ধ করলে অন্ধকারের পথগুলোই তো উন্মুক্ত হয়।

কেডিএ-র এই ‘তুঘলকি’ কাণ্ডটি কেবল একটি ভুল নয়, এটি একটি পরিকল্পিত অবমাননা। এই ব্যানারটি টাঙানোর আদেশ যিনি দিয়েছেন এবং যারা এটি বাস্তবায়ন করেছেন, তাদের প্রত্যেকের প্রশাসনিক ও নৈতিক জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।

একটি আধুনিক রাষ্ট্র কখনোই শিল্প-সংস্কৃতিকে ভয় পেতে পারে না। গান-বাজনা অসামাজিক নয়; বরং গান-বাজনাকে যারা অপরাধের কাতারে নামিয়ে আনতে চায়, সেই বিকৃত মানসিকতাটাই অসামাজিক। কেডিএ-র উচিত অবিলম্বে এই হাস্যকর ও বিতর্কিত ব্যানারটি অপসারণ করা এবং খুলনার সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। সময় এসেছে প্রতিবাদ করার। কংক্রিটের উন্নয়নের চেয়ে মানুষের সাংস্কৃতিক মুক্তি অনেক বেশি জরুরি।

লেখক: আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু, সংবাদকর্মী, মোবাইল: ০১৭১২২৭৮৫২০