শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি।।
আশাশুনি উপজেলার হিজলিয়া মৌজার বালুমহালটি জেলার একমাত্র বালুমহাল। গত ১৩ এপ্রিল (৩১ চৈত্র) এই বালুমহাল থেকে বালু তোলার সময়সীমা শেষ হয়েছে। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য নতুন করে এই বালুমহাল ইজারা নেওয়ার জন্য একাধিক আবেদনপত্র জমা পড়েছে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে। অথচ আগের বছরের জন্য ইজারা নেওয়া ব্যক্তিরা এখনও বালু তুলে নিচ্ছেন।
১৪৩২ বাংলা সনের জন্য আশাশুনি উপজেলার হিজলিয়া মৌজার মাত্র পাঁচ একর জায়গা বালুমহাল ঘোষণা করে ইজারা দেওয়া হয়। তবে বছরজুড়ে খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বালু লুটে নেওয়া হয়। ইজারা নেওয়া চক্রটি প্রভাবশালী হওয়ায় মেয়াদ শেষের পরও তারা কৌশলে বালু তুলছেন।
গতকাল মঙ্গলবার দেখা গেছে, খোলপেটুয়া নদীর ঘোলা অংশে তিনটি কার্গো দিয়ে খননযন্ত্রের সাহায্যে বালু তোলা হচ্ছে। কার্গোভর্তি বালু পাশের বিল্লাল হোসেনের বালুর আড়তে নামিয়ে আবারও তারা একই জায়গায় ফিরে বালু সংগ্রহ করছে।
বালু তোলায় নিয়োজিত বোট মালিক কালীগঞ্জের কালিকাপুর গ্রামের আব্দুল আলিমের ভাষ্য, তারা ছয় টাকা (প্রতি ফুট) হিসেবে আড়ত মালিককে বালু তুলে দিচ্ছেন। এর আগে নদী থেকে বালু তোলার জন্য আশাশুনি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শেখ শরিফুল আহসান টোকনের মাধ্যমে আগের বছরের ইজারাগ্রহীতাদের আড়াই টাকা করে (প্রতি ফুট) পরিশোধ করেছেন।
পাশের ঝাপালী অংশে বালু তুলছিলেন আশাশুনি উপজেলা সদরের বোট মালিক ওয়েজকুরুনি। তাঁর ভাষ্য, চারটি বোট নিয়ে তারা বালু তুলছেন। নির্মাণাধীন একটি কলেজসহ ঝাপালীর মিজানুর রহমানের আড়ত ও বাঁশতলা ব্রিজসংলগ্ন আব্দুর রশিদের আড়তে সরবরাহ করছেন বালু।
ওয়েজকুরুনি আরও বলেন, ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও তাদের মালিকরা (ইজারাদার) প্রশাসন ও নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করেই বালু তুলছেন। নদীতে নামার আগেই তারা কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল সরদারের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে বালু তোলার জন্য রসিদও নিয়েছেন।
এ বিষয়ে জিয়াউল সরদারের ভাষ্য, ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও অনেকে বালু তুলছেন। গত বছরের জন্য ইজারা নেওয়া ব্যক্তিদের নামের রসিদ দেখিয়ে কেউ কেউ সুযোগ নিচ্ছেন। তিনি কারও থেকে টাকা নেওয়া বা কাউকে রসিদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার কুপোট এলাকায় দেখা যায়, পাশের খোলপেটুয়া নদীর চর থেকে দুটি বাল্কহেডে বালু তোলা। এমবি তুষার ও এমবি রবিউল নামের বাল্কহেড দুটি খুলনার পাইকগাছা থেকে এসেছে। এলাকাবাসী জানায়, প্রায় তিন মাস ধরে অতিভাঙনপ্রবণ ওই এলাকা থেকে এগুলো দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে।
একটি বাল্কহেডের চালক রবিউল ইসলামের ভাষ্য, তাদের বাল্কহেড ভাড়ায় নিয়ে এসেছেন যুবদল নেতা আনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুর ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুর রহমান বাবু। তাই ভাড়া নেওয়া ব্যক্তিদের দেখিয়ে দেওয়া জায়গা থেকেই তারা বালু তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, জনগণের ঝামেলা ও প্রশাসনের চোখ এড়াতে তারা রাতে বালু তুলছেন। পরে এসব বালু সরবরাহ করছেন পাশের আল্লাহর দান বালুর আড়ত, উপকূলীয় বালুর আড়তসহ ছয়টি আড়তে।
শ্যামনগর উপজেলার বিড়ালাক্ষ্মী গ্রামের সামছুর রহমান, কুপোট গ্রামের আফজাল হোসেন ও দুর্গবাটি গ্রামের প্রভাষক পরীক্ষিত মণ্ডলসহ স্থানীয় লোকজন জানান, প্রতিবছরই তারা নদীভাঙনের শিকার হচ্ছেন। ভাঙনের মুখে থাকা সত্ত্বেও পাশের খোলপেটুয়া নদী থেকে প্রতি রাতে দুটি বাল্কহেড ও চার-পাঁচটি কার্গোতে করে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। গ্রামবাসী আপত্তি জানালে নেতারা নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।
আশাশুনি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শেখ শরিফুল আহসান টোকনের ভাষ্য, যুবদল নেতা আনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুর ও আব্দুর রহমান বাবুসহ তারা ১৮ জন মিলে বালুমহাল ইজারা নিয়েছিলেন। তবে কাগজ ১৫ দিন পরে পেয়েছিলেন। এ কারণে কাগজেকলমে মেয়াদ শেষ হলেও বালু তোলার মেয়াদ তাদের ১৫ দিন বেশি পাওয়ার কথা।
তিনি আরও বলেন, ‘এখন অনেকেই বালু তুলছেন। কোনো জবাবদিহির মুখে পড়লে হয়তো বা আমাদের নাম ব্যবহার করে থাকতে পারেন।’
এ বিষয়ে আশাশুনির ইউএনও শ্যামানন্দ কুণ্ডু বলেন, এখনও কাউকে বালু তোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আগের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন করে অনুমতি ছাড়া কেউ বালু তুলতে পারবেন না। কয়েকটি এলাকা থেকে বালু তোলার বিষয়ে তথ্য দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যবস্থা নেবো।’
শ্যামনগরের ইউএনও শামসুজ্জাহান কনক জানান, তারা অননুমোদিত জায়গা থেকে বালু তোলায় জরিমানা করেছিলেন। ইজারা পাওয়ার আগে খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু তোলা হলে আইনি ব্যবস্থা নেবেন।










































