Home স্বাস্থ্য গোড়ালির হাড় বৃদ্ধির কারণ এবং করণীয়

গোড়ালির হাড় বৃদ্ধির কারণ এবং করণীয়

1


ডা. জি এম জাহাঙ্গীর হোসাইন।।

মানবদেহে অসংখ্য হাড় রয়েছে। অনেক সময় এসব হাড়ে অতিরিক্ত হাড় গজায়। এর মধ্যে পায়ের ক্যালকেনিয়াম (গোড়ালির হাড়) অন্যতম। সাধারণত এই অতিরিক্ত হাড় গোড়ালির নিচে বা পেছনে গড়ে ওঠে। ক্যালকেনিয়াম পায়ের সবচেয়ে বড় হাড়; দাঁড়ানো বা হাঁটার সময় এটি প্রথম মাটির সংস্পর্শে আসে এবং শরীরের পুরো ওজন বহন করে। ফলে সামান্য অসঙ্গতিতেও এই হাড়ে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

অতিরিক্ত হাড় হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। অসঙ্গতিপূর্ণ বা অস্বস্তিকর জুতা পরলে স্পার তৈরি হতে পারে। পায়ের পেশি দুর্বল হলে পায়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা স্পার গঠনে ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন ধরে প্লান্টার ফাসিয়া ও টেনডনে প্রদাহ থাকলেও গোড়ালিতে অতিরিক্ত হাড় জন্মাতে পারে। শরীরের অতিরিক্ত ওজনও এ সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিসেও হিল স্পার হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে এটি বংশগত কারণেও দেখা যায়। এ সমস্যার প্রধান উপসর্গ হলো ব্যথা, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর হাঁটা শুরু করলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। কিছুক্ষণ চলাফেরা করলে ব্যথা ধীরে ধীরে কমে আসে এবং বিশ্রাম অবস্থায় সাধারণত ব্যথা থাকে না। কখনও কখনও ব্যথা এত বেশি হয় যে পায়ে ভর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত হাড় আশপাশের পেশি, টেনডন, ফাসিয়া, রক্তনালি ও স্নায়ুতে টানজনিত (ট্র্যাকশন) ইনজুরি সৃষ্টি করে। ফলে ব্যথা ও টিস্যুতে প্রদাহ জমে থাকে। কখনও পায়ের তলা লাল হয়ে যায়, হিলপ্যাড পাতলা বা শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং পায়ের স্বাভাবিক আর্চ নষ্ট হয়ে ফ্ল্যাট ফুটের মতো অবস্থা তৈরি হয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় কিছু করণীয় রয়েছে। উপযুক্ত মাপের নরম জুতা ব্যবহার করলে উপসর্গ কমে। হিল ও আর্চ সাপোর্টযুক্ত জুতা পরা বিশেষভাবে উপকারী। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আঁড়াআঁড়িভাবে পায়ের তলায় হালকা মেসেজ করা যেতে পারে।

দিনে দুবার কুসুম গরম পানির সেঁক বা ঠান্ডা সেঁক দিলে আরাম মেলে। পায়ের তলা ও পায়ের পেশি নমনীয় ও শক্তিশালী করতে নিয়মিত স্ট্রেচিং ও ব্যায়াম প্রয়োজন। প্রয়োজনে অ্যানালজেসিক ওষুধ সেবনে ব্যথা কমানো যায়। কখনও স্থানীয়ভাবে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিলে দ্রুত উপশম পাওয়া যায়। তবে এটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হয়। নইলে হিলপ্যাড ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। ফিজিক্যাল থেরাপি, যেমন- এসডব্লিউডি, ইউএসটি ও ওয়াক্স বাথ ব্যবহারেও উপকার পাওয়া যায়।

তবে এ রোগের একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটি পুনরায় ফিরে আসতে পারে। কারণ হাড়ের বৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও বিদ্যমান স্পার সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা সবসময় সম্ভব হয় না। যদি মেডিক্যাল চিকিৎসায় উপকার না পাওয়া যায়, রোগ বারবার ফিরে আসে, হিলপ্যাড ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, পায়ে ভর দিতে সমস্যা হয় বা হাড়ের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তাহলে আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। এ পদ্ধতিতে গোড়ালির দুপাশে ছোট ছিদ্র করে আর্থ্রোস্কোপ প্রবেশ করিয়ে অতিরিক্ত হাড় অপসারণ (শেভিং) করা হয় এবং প্রয়োজনে প্লান্টার ফাসিয়ার আংশিক বিচ্ছেদ করা হয়। এতে উপসর্গ দ্রুত কমে আসে। তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

লেখক : হাড় ও জোড়া বিশেষজ্ঞ এবং আর্থ্রোস্কোপিক সার্জন

অধ্যাপক, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ, নিটোর

চেম্বার : বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল লিমিটেড, শ্যামলী, মিরপুর রোড, ঢাকা। ফোন : ১০৬৩৩, ০১৭৪৬৬০০৫৮২