Home Lead যাদের কাছে মানুষের মূল্যয়ন ও আত্মসম্মান নেই, তাদের কাছে দেশ নিরাপদ হতে...

যাদের কাছে মানুষের মূল্যয়ন ও আত্মসম্মান নেই, তাদের কাছে দেশ নিরাপদ হতে নয়

31

খুলনার জনসভায় তারেক রহমান

স্টাফ রিপোর্টার।।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, যাদের কাছে মানুষের মূল্যয়ন নেই, আত্ম সম্মান নেই। তাদের কাছে দেশ নিরাপদ হতে পারে না। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে প্রভাতী স্কুল মাঠে বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি জনসভায় ২৬ মিনিট বক্তব্য দেন।


একটি রাজনৈতিক দলের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করবে। কিন্তু আমরা দেখছি, একটি রাজনৈতিক বাংলাদেশের অর্ধেক নারী গোষ্ঠীকে কিভাবে ঘরে আটকে রাখতে চায়। একটি রাজনৈতিক দলের নেতা পরিস্কার ভাবে বলে দিয়েছে যে, তারা কোনভাবেই নারী নেতৃত্ব বিশ্বাস করে না। দুইদিন আগে ওই দলের এক নেতা কর্মসংস্থানে নিয়োজিত মা-বোনদের উদ্দেশে এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা বলতেও লজ্জা হচ্ছে। এমন একটি শব্দ তিনি আমাদের মা-বোনদের জন্য ব্যবহার করেছে। যা এদেশের জন্য একটি কল্ঙ্ক সরূপ। এইদেশের অধিকাংশ খেটে খাওয়া পরিবারের নারী কোনো না কোনভাবে সংসারের উপার্জনের জন্য কাজ করে থাকেন। পোশাকশিল্পে ৪০ লক্ষ নারী শ্রমিকরা কাজ করেন। নিম্নবিত্ত হোক, মধ্যবিত্ত সকল পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করে জীবন নির্বাহ করে থাকে। কিন্ত আজ আমরা দেখেছি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা কিভাবে নারীদের অসম্মানিত করেছেন।


বিএনপি প্রধান আরো বলেন, যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছে— নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল মহিলা ব্যবসায়ী। তাহলে আজকে কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো বাংলাদেশের নারী সমাজ। তাবদ পৃথিবীর মানুষকে অপমান করা হলো। যে দলটি নির্বাচনের আগে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরের মধ্যে বন্দী করতে চায়, অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অপমান করে। তাহলে তারা যদি নির্বাচনে সুযোগ পায়, তাহলে তাদের আচরণ কী হতে পারে। যার উদাহ্রণ আমরা ১৯৭১ সালে পেয়েছিলাম।


তারেক রহমান বলেন, এরা শুধু নিজেদের স্বার্থের কথাই বোঝে, এরা ধর্মকে ব্যবহার করে স্বার্থ রক্ষার জন্য। যেখানে যেমন প্রয়োজন সেখানে তেমন তারা ধর্মকে ব্যবহার করে।


তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ওই রাজনৈতিক দল আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাত দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে মিথ্যাচার করে তারা নিজেদের আসল চরিত্র প্রকাশ করছে। যারা নারীদের অসম্মান করে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং যারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে, তারা কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না। বাংলাদেশের তাবোদ মা-বোনদের এর বিরুদ্ধে কী করবেন ভাবতে হবে।


খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা। মহানগর সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী আলী আসগর লবী, খুলনা-১ আসনের প্রার্থী আমীর এজাজ খান, খুলনা-৬ আসনের প্রার্থী এস এম মনিরুর হাসান বাপ্পী, সাতক্ষীরা১ আসনের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সাতক্ষীরা- ২ আসনের প্রার্থী মো: আব্দুল রউফ, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন, সাতক্ষীরা -৪ আসনের প্রার্থী মো: মনিরুজ্জামান, বাগেরহাট ১ আসনের ধানের শীষের প্রার্র্র্র্র্থী কপিল কৃষ্ণ মন্ডল, বাগেরহাট-২ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার জাকির হোসেন, বাগেরহাট-৩ আসনের প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট ৪ আসনের প্রার্থী সোমনাথ দে প্রমুখ। এর আগে বেলা ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে জনসভা শুরু হয়। খুলনায় এটি তারেক রহমানের চতুর্থ সফর। সর্বশেষ ২০০৪ সালে তিনি খুলনা এসেছিলেন।


বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে, শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, দেশকে আমাদের সামনে দিকে নিতে হবে। গত ১৫-১৬ বছর বহু নেতাকর্মী খুন-গুম ও হত্যার শিকার হয়েছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীরা গায়েবী মামলার অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তারপরেও বাংলাদেশ মানুষ ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট মাসে দল-মত নির্বিশেষে সকলে রাজপথে নেমে এসে বাংলাদেশের স্বৈরাচারকে এই দেশ থেকে বিদায় করেছিল। বিগত ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক অধিকার অর্থাৎ ভোটের অধিকার পায়নি। অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। বাংলাদেশের মানুষ তার মতামতের ভিত্তিতে তার প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনি। শুধু সেটি জাতীয় নির্বাচেনর ক্ষেত্রেই নয়, এমন কী স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই ঘটনা দেখা গিয়েছে।


তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশর মানুষ ১৬ বছর ধরে মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেনি। কেউ যদি কথা বলার চেষ্টা করা করেছে, আমরা দেখেছি বিভাবে রাতের আঁধারে খুন-হুম হয়েছে। তুলে নেওয়া হয়েছে। আজ সময় এসেছে। বাংলাদেশের মানুষকে যে অধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, তা আগামী ১২ তারিখ সেই অধিকার প্রয়োগ করবে।


বিএনপি চেয়ারম্যান অতীতের রাষ্ট্র পরিচলনার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, অতীতেও আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম। একইভাবে আগামী দিনে বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনে আল্লাহতালার রহমতে আমরা সরকার গঠন করলে আমাদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে দেশকে পুনগর্ঠন করা। কিন্তু দেশ পুনর্গঠনে সকল দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সকল মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন কাজ করতে হবে। শুধু এক ধরণের মানুষ নিয়ে অন্যকোন কাজ করা গেলেও কখনোই দেশ পুনগর্ঠন যায় না।
তারেক রহমান বলেন, এই দেশে জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এই ২০ কোটি মধ্যে অন্ত্যত ১০ কোটি জনসংখ্যা হচ্ছে এদেশের নারী সমাজ। অর্থাৎ জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী সমাজ। এই নারী অর্ধেক জনসংখ্যাকে পেছনে রেখে আমরা যতোই বড় কথা বলি না কেন; যতো পরিকল্পনা করি না কেন -দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। কোনভাবেই সম্ভব নয়, দেশকে পুনগর্ঠন করা। এজন্যই দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে স্কুল পর্যায় থেকে মেয়েদের কলেজ পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। যাতে করে এই বিশাল জনশক্তি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয় হয় এবং যাতে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তারা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকে।


খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই অঞ্চলকে আবার জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে, নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।


তরুণ সমাজের জন্য আইটি পার্ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক সহজে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বর্তমানে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ রয়েছে, তা সুদসহ মওকুফ করা হবে।


তিনি বলেন, দেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।