খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম দ্বি-পাক্ষিক বিদেশ সফর সফলভাবে শেষ করে শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে দেশে ফিরেছেন। ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত ছয় দিনের এই সফরে তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং বাংলাদেশের শ্রমবাজার, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের ভিত্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
মালয়েশিয়া সফর>>
শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সে নতুন সম্ভাবনা
সফরের প্রথম ধাপে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় শ্রমবাজার, মুক্ত বাণিজ্য, প্রবাসী কল্যাণ এবং বিনিয়োগ।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA)
দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে অগ্রগতি বাংলাদেশের রফতানির জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে তৈরি পোশাক, ওষুধ ও কৃষিপণ্য ভবিষ্যতে শুল্ক সুবিধা পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশ যদি মালয়েশিয়ায় রফতানি ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে, তাহলে বছরে প্রায় ৫০০-৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা
মালয়েশিয়ায় সরকারি (G2G) ব্যবস্থায় কর্মী পাঠানো, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন ব্যয় কমাতে ৩৩ দফার যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর, আইটি ও হেলথকেয়ারের মতো দক্ষ খাতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো শুরু হলে ভবিষ্যতে বছরে ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত রেমিট্যান্স আসার সম্ভাবনার কথা সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন।
মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ সম্ভাবনা
সফরকালে মালয়েশিয়ার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাস, আজিয়াটা এবং এয়ারএশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ব্যবসায়িক মহলের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন বছরে মালয়েশিয়া থেকে ৩০০-৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আসতে পারে।
হালাল শিল্পে নতুন সুযোগ
মালয়েশিয়ার হালাল সার্টিফিকেশন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্য, কসমেটিকস এবং ভোক্তা পণ্যের জন্য বৈশ্বিক হালাল বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়েই এখান থেকে বছরে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার নতুন রফতানি আয় সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সার্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব
মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশ কোনো সরাসরি ঋণ বা অনুদান নেয়নি। বরং, নীতিগত ও কাঠামোগত যেসব সমঝোতা হয়েছে, সেগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে বছরে আনুমানিক ২৫ থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীন সফর>>
১৭টি সমঝোতা স্মারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্রীষ্মকালীন দাভোস সম্মেলনে অংশ নেন। পরে বেইজিংয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়।
সম্ভাব্য উন্নয়ন সহায়তা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সফর-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ প্রায় তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের উন্নয়ন সহায়তা, রেয়াতি ঋণ ও অনুদান পাওয়ার আশা করছে।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল ঘিরে বড় অগ্রগতি হয়েছে। এটি চালু হলে প্রাথমিক ধাপে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন
সফরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অর্থায়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— মোংলা সমুদ্রবন্দর আধুনিকায়নে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার রেয়াতি ঋণ। ডিপিডিসির বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়নে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প। পিজিসিবির প্রায় ৯৬৬ মিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পে অর্থায়নের জটিলতা দূর করার উদ্যোগ।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ
বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। নতুন সমঝোতার আওতায় কৃষিপণ্য ও ওষুধ রফতানি বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি আংশিক কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ঘাটতি মাত্র ২-৩ শতাংশ কমানো গেলেও বছরে ৫০০-৭০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
প্রযুক্তি ও শিল্পায়ন
চীনের সঙ্গে হওয়া সমঝোতাগুলোর মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান (EV), ভারী শিল্প এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে চীন সফর দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বৃহৎ বিনিয়োগের ভিত্তি শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
সব পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে মালয়েশিয়া ও চীন সফর থেকে ফিরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুব সংক্ষিপ্ত বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। এখানে তিনটি পর্ব ছিল। প্রথম পর্বে তিনি মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানকার প্রধানমন্ত্রী ও রাজার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলোচনা করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর পর চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট এবং সিইওসহ বেশকিছু ইনভেস্টরদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরবর্তী সময়ে চীনের রাজধানীতে প্রিমিয়ার ইনভাইটেশনে গিয়ে সেখানেও প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘আপনাদেরকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার রাজা ও প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের প্রিমিয়ার এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও বিনিয়োগ কীভাবে বাড়ানো যায়, বাণিজ্যের প্রসার কীভাবে করা যায়, কর্মসংস্থান কীভাবে সৃষ্টি করা যায়, পিপল টু পিপল কানেক্টিভিটি অর্থাৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কালচার, মিডিয়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিন্তু দুই দেশের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।’
পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কীভাবে মালয়েশিয়া ও চীন ভূমিকা রাখতে পারে সেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকার প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানান মাহাদী আমিন।











































