Home Lead ‘এআই’ চ্যালেঞ্জে নির্বাচনী প্রচারণা

‘এআই’ চ্যালেঞ্জে নির্বাচনী প্রচারণা

15
3d rendering humanoid robot with ai text in ciucuit pattern

২৭ দিনে অন্তত ৩৯৩টি ভুল তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার যুদ্ধ শুরু হয়েছে সপ্তাহখানেক আগে। প্রায় দুই সহস্রাধিক প্রার্থী তুমুল ব্যস্ত প্রচারণায়। এই প্রচার যুদ্ধ চলবে আগামী ১০ই ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। তবে পোস্টারবিহীন এবারের নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থীদের অন্যতম হাতিয়ার ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম’। নির্বাচন কমিশনের তরফে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও অনেকেই তার তোয়াক্কা করছেন না। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বিভিন্ন কনটেন্ট ও ফটোকার্ড তৈরি করে সুকৌশলে সমর্থকদের দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি। যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোটারদের মাঝে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ। এদের মধ্যে সরাসরি ফেসবুক ব্যবহারকারী প্রায় ৭ কোটি ২৬ লাখের বেশি। যাদের মধ্যে সিংহভাগই ১৮ থেকে ২৪ বছরের তরুণ-তরুণী। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের কথা চিন্তা করে এবারই প্রথম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ভোটযুদ্ধে প্রার্থীদের জন্য অফিসিয়ালি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ইসি’র জারি করা ‘নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫’ এর ১৬ ধারাতে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করতে পারবেন, তবে সেই ক্ষেত্রে (ক) প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে। তবে প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করতে পারবেন না। একইসঙ্গে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ কোনো প্রকার ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করতে পারবেন না। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদন করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবেন না। তবে ইসি’র এই বিধিনিষেধের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, সংসদ নির্বাচন ঘিরে জানুয়ারির এই ২৭ দিনে অন্তত ৩৯৩টি ভুল তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি যুক্ত করে ‘তারেক রহমানের সহযোগিতায় জেলখানা থেকে বের হয়ে বিএনপিতে যোগ দিলেন মেয়র আইভী’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড ও শর্ট ভিডিও টিকটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। ভিডিওটি প্রায় ২ লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে।
তবে ফ্যাক্টচেক বলছে, তারেক রহমানের সহযোগিতায় সেলিনা হায়াৎ আইভী কারাগার থেকে মুক্তি পাননি এবং তিনি বিএনপিতেও যোগদান করেননি। তারেক রহমানের সঙ্গে আইভী রহমানের ছবিও আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি ব্যবহার করে কোনো প্রকার নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই আলোচিত ওই ভিডিওটি প্রচার করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম হয়েছে, আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না যেকোনো মূল্যে এবার আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতেই হবে’- এমন মন্তব্য করেছেন দাবিতে দৈনিক কালের কণ্ঠের ডিজাইন সংবলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা অফিসটি বলছে, তারা এমন কোনো ফটোকার্ডই প্রকাশ করেনি। এ ছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, তারেক রহমানও এমন কোনো মন্তব্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ওই পত্রিকা অফিসের ফেসবুক পেজে প্রচারিত ভিন্ন একটি ফটোকার্ড এডিট করে আলোচিত ওই ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়া আরেক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে- জামায়াতের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের লোগো দিয়ে প্রচার হওয়া ওই ভিডিওটিতে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘শেখ হাসিনার সালাম নিন, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন’। তবে বাস্তবে সাম্প্রতিক সময়ের শেখ হাসিনা জনসম্মুখে কোনো জনসভায় অংশ নেননি এবং দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোটও চাননি।
প্রকৃতপক্ষে, ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার জনসভার পুরনো ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। এমনকি তিনি বর্তমানে দেশের মাটিতেই নেই। ২০২৩ সালের ১১ই নভেম্বর মাতারবাড়ির জনসভায় নৌকার ভোট চাওয়া ভিডিও এডিট করে এখন প্রচারণা করা হচ্ছে। আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, গত ২২শে জানুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ছুফুয়া এলাকায় নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দাবি করছেন, ‘ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধান ভারতের সঙ্গে তিনটি শর্তে চুক্তি করেছেন। প্রথমত, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল যারা, তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র কিনতে হলে ভারতের অনুমতি নিতে হবে এবং ভারতের অনুমতি ছাড়া কোনো অস্ত্র কেনা যাবে না। তৃতীয়ত, এ দেশের ইসলামপন্থি দলগুলোকে দমন করতে হবে।’ বাস্তবে এ বিষয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার ওয়েবসাইটে অন্তত গত এক বছরে তারেক রহমানের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এমন কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।
এসব বিষয়ে তথ্য ব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারের সুবিধা হলো- অল্প সময়ে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো যায়। আর অসুবিধা হচ্ছে- একইভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতাও দ্রুত ছড়ানো যায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা বেশি বা জনপ্রিয়তা বেশি থাকলেও তা নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নির্ণায়ক হবে না। বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই’র অপব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আধুনিক হুমকি অস্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে যেকোনো প্রযুক্তিনির্ভর হস্তক্ষেপ রোধে আমরা সতর্ক আছি। তথ্য সূত্র: মানবজমিন।