ঢাকা অফিস
খেলাপি ঋণ গ্রহীতার নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমতি চেয়েছে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ-এবিবি। ঋণখেলাপিদের উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুবিধা আইনিভাবে রহিত করার ব্যবস্থাও চাওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্ধকি সম্পদের ডাটাবেজ প্রণয়ন, নিলামে বন্ধকী সম্পদ বিক্রি সহজ করা, ঋণখেলাপিরা বিদেশ যেতে ব্যাংক বা আদালতের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে করণীয় বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সম্প্রতি এসব প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবিবি। সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সাক্ষরিত এ চিঠিতে পাঁচ ধাপে প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। গভর্নর বরাবর দেওয়া চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক বৈঠকে খেলাপি ঋণ কমাতে করণীয় বিষয়ে এমডিদের প্রস্তাবনা দিতে বলা হয়। সে আলোকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরে হয়েছে।
ব্যাংকের এমডিরা এমন এক সময়ে এসব প্রস্তাবনা দিয়েছেন- ব্যাংক খাতের এক তৃতীয়াংশের বেশি ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অবশ্য ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৩০ শতাংশের আশপাশে নেমেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ ছিল খেলাপি। সে বিবেচনায় এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বা দ্বিগুণের বেশি। খেলাপি ঋণের উচ্চহার অর্থনীতি ও ব্যবসাুবাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। নতুন বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হচ্ছে তেমন না। অনেক আগেই এসব ঋণ খেলাপি হলেও নানা নীতি সহায়তার আড়ালে তা লুকিয়ে রাখা হতো। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আসল চিত্র দেখাতে হচ্ছে।
এমডিদের প্রস্তাবনার প্রথম ধাপে খেলাপি ঋণ তাৎক্ষণিক কমানোর উপায় তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে খেলাপি ঋণ আংশিক অবলোপনের সুবিধা চাওয়া হয়েছে। লিয়েনকৃত শেয়ার নগদায়ণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এছাড়া মৃত্যু, মরণব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহ ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, কিংবা তার একক-মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র এবং ছোট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুত ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে হেড অফ আইসিসির মতামত নেওয়ার শর্ত লাঘব চাওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের ঋণের অর্থ পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করতে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতারা ব্যাংক বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা, খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন এবং খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যেকোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুপযোগী ঘোষণা করা।
উল্লেখ্য, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও আরপিও অনুযায়ী জাতীয় এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারে না। অবশ্য অনেক ঋণখেলাপি সাময়িক সময়ের জন্য আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তৃতীয় ধাপে বন্ধকি সম্পদ বিক্রয়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদারে ৬টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবনার পরের ধাপে উঠে এসেছে খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা পরিচালনা সহজ করা এবং মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের বিষয়টি।
সর্বশেষ ধাপে নতুন খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ঠেকানোর প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছেু জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ করতে হবে। নিবন্ধক কিংবা তহশিল অফিসে বন্ধকি সম্পদের তালিকা সহজে যাচাই করার সুবিধা নিশ্চিত এবং সিআইবি ডাটাবেজের মতো বন্ধকি সম্পদের ডাটাবেজ প্রণয়ন এবং সহজে তা যাচাই করার সুবিধা চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবনার সমাপনীতে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে দেশের খেলাপি ঋণ আদায় তথা ব্যাংকিং খাতর পুনরুজ্জীবিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন। এ বিষয়ে দূরদর্শী নেতৃত্ব ও নীতি সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবেন।








































