খুলনাঞ্চল ডেস্ক।।
“নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের ঝলমলে নিয়ন আলো, ম্যানহাটানের আকাশচুম্বী দালান, কিংবা সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি সাম্রাজ্য- আটলান্টিকের ওপারের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এক আরাধ্য স্বপ্নের নাম। ল্যাটিন আমেরিকার দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার জনাকীর্ণ শহর, এমনকি পূর্ব ইউরোপের সংঘাতময় অঞ্চল- পৃথিবীর এমন কোনো প্রান্ত নেই, যেখানকার মানুষ ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর মোহে আচ্ছন্ন নয়। এই স্বপ্ন কেবল একটি ভৌগোলিক গন্তব্যে পৌঁছানো নয়; এটি সচ্ছলতা, স্বাধীনতা এবং উন্নত জীবনের এক অদৃশ্য হাতছানি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই স্বপ্নের পথটি কি আগের মতো মসৃণ? বিস্তারিত জানাচ্ছেন শামস বিশ্বাস
গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায় যে শব্দটি বারবার উঠে আসছে, তা হলো- ‘মার্কিন ভিসা নীতি’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার বিমানবন্দর থেকে বিশেষ চার্টার্ড বিমানে অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর দৃশ্য। হাতকড়া পরা অবস্থায় শত শত মানুষের ফিরে আসার ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর স্বভাবতই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে- আমেরিকা কি তার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে? নাকি এটি তাদের নিয়মিত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ারই একটি কঠোর প্রয়োগ মাত্র?
বাংলাদেশেও এই আলোচনা এখন তুঙ্গে। চায়ের কাপ থেকে ড্রয়িংরুম- সর্বত্রই ভিসা নীতি নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা। তবে আবেগের বশবর্তী না হয়ে, পুরো বিষয়টি যদি আমরা আন্তর্জাতিক লেন্স বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিচার করি, তবে দেখা যাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কোনো একক দেশের সংকট নয়, বরং বিশ্বজোড়া অভিবাসন রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এক জটিল সমীকরণ। এই ফিচারের মাধ্যমে আমরা সেই সমীকরণের গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করব, যেখানে কোনো বিতর্ক নয়, বরং তথ্য ও উপাত্তই কথা বলবে।
ভিসা নীতি বা নিষেধাজ্ঞা
আমেরিকার ভিসা নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভীতি কাজ করে, তার মূল কারণ তথ্যের অভাব। অনেকেই মনে করেন, মার্কিন ভিসা নীতি বা কড়াকড়ি হয়তো নির্দিষ্ট কোনো দেশকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বা অপমান করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাস এবং মার্কিন ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’ (INA) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক, নিয়মিত এবং দীর্ঘদিনের পুরনো প্রক্রিয়া। ভিসা প্রদান করা বা বাতিল করা যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের একান্ত নিজস্ব অধিকার এবং আমেরিকা তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এই অধিকারটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে থাকে।
‘সেকশন ২১২(এ)(৩)(সি)’- আইনের এই ধারাটি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত। কিন্তু এই ধারাটির প্রয়োগ বিশ্বজুড়েই ঘটে থাকে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিং এবং বার্ষিক রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর পেছনে সাধারণত গণতন্ত্রের সুরক্ষা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন কিংবা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তি থাকে। বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমরা আন্তর্জাতিক কয়েকটি উদাহরণের দিকে তাকাতে পারি। আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়ার কথাই ধরা যাক। ২০২৩ সালের নাইজেরিয়ার সাধারণ নির্বাচনের সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি এবং ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মার্কিন প্রশাসন নাইজেরিয়ার নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। একইভাবে, পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় যখন বিতর্কিত আইন পাস করা হলো এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হলো, তখনও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা কড়াকড়ি আরোপ করে। ল্যাটিন আমেরিকার দিকে তাকালে এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস এবং এল সালভাদর- এই দেশগুলোর বহু উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং রাজনীতিবিদদের ওপর ‘দুর্নীতি ও অগণতান্ত্রিক আচরণের’ অভিযোগে ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এমনকি ইউরোপের দেশ বেলারুশের ওপরও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জেরে কঠোর ভিসা নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে বহুদিন ধরে। অর্থাৎ বিষয়টি কোনো একক দেশের জন্য লজ্জার বা ভয়ের বিষয় নয়; বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৈশ্বিক পলিসি বা ‘ডিপ্লোম্যাটিক টুল’, যা তারা তাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনে ব্যবহার করে।
আমেরিকান ড্রিমের ইতিহাস
আমেরিকান ড্রিম হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেন্দ্রীয় আদর্শ- কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা এবং সুযোগের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি, তার জন্মস্থান বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে, সচ্ছল, স্বাধীন ও সুখী জীবন গড়ে তুলতে পারবে। এর শিকড় ১৭০০ শতাব্দীতে ইউরোপীয় উপনিবেশকদের সঙ্গে। ধর্মীয় নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে পিউরিটানরা নতুন বিশ্বে এসে একটি সমতা ও স্বাধীনতার সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে টমাস জেফারসন লিখলেন : ‘সব মানুষ সমান সৃষ্টি হয়েছে- জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অনুসরণের অধিকার নিয়ে।’ এটিই আমেরিকান ড্রিমের মূলভিত্তি।
১৯০০ শতাব্দীতে গোল্ড রাশ, পশ্চিমমুখী বিস্তার এবং ফ্রন্টিয়ার জীবন এই স্বপ্নকে জনপ্রিয় করে তোলে- কঠোর পরিশ্রমে ধনী হওয়ার সম্ভাবনা।
শব্দটি নিজে প্রথম ব্যবহার করেন ইতিহাসবিদ জেমস ট্রুসলো অ্যাডামস ১৯৩১ সালে তার বই The Epic of America-তে। মহামন্দার সময়ে তিনি বলেন, এটি কেবল গাড়ি-বাড়ির স্বপ্ন নয়, বরং সমতা ও মানবিক পূর্ণতার স্বপ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০-এর দশকে এটি মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রাকেন্দ্রিক (সাবার্বিয়ান বাড়ি, গাড়ি, টেলিভিশন) হয়ে ওঠে। ১৯৬০-৭০-এর দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে এটি সবার জন্য সমান সুযোগের দাবিতে রূপ নেয়।
আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ঋণের বোঝার কারণে অনেকে বলেন এই স্বপ্ন কিছুটা দূরের হয়ে গেছে। তবু বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি এখনও আশা ও সম্ভাবনার প্রতীক।
ভুল ধারণা বনাম বাস্তবতা
ভিসা নীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সাধারণ মানুষ এই ‘রাজনৈতিক ভিসা নীতি’র সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত ভিসা আবেদনের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেন। একটি বিষয় পাঠকদের কাছে পরিষ্কার থাকা অত্যন্ত জরুরি- রাজনৈতিক কারণে যখন কোনো দেশের ওপর ভিসা নীতি প্রয়োগ করা হয়, তখন সেটি মূলত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা বা যারা সুনির্দিষ্টভাবে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত, তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য হয়। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী, যিনি তার মেধা দিয়ে স্কলারশিপ নিয়ে হার্ভার্ড, এমআইটি বা টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যেতে চান; কিংবা একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, যিনি নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত কোনো টেক্সটাইল মেলায় অংশ নিতে চান- তাদের ওপর এই রাজনৈতিক নীতির কোনো প্রভাব নেই। মার্কিন কনস্যুলার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে। একজন কনস্যুলার অফিসার যখন কোনো ভিসা প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেন, তখন তিনি দেখেন ওই প্রার্থীর যোগ্যতা, তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আর্থিক সচ্ছলতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- ভ্রমণ শেষে নিজ দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা। প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় বা তার দেশের ওপর কোনো ভিসা নীতি বলবৎ আছে কিনা- সেটি সাধারণ ট্যুরিস্ট বা স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় নয়। তাই ‘ভিসা নীতি’ শব্দটিকে ঘিরে সমাজে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা অনেকাংশেই অমূলক। বরং পরিসংখ্যান বলছে, যেসব দেশের ওপর রাজনৈতিক ভিসা নিষেধাজ্ঞা আছে, সেসব দেশ থেকেও প্রতিবছর হাজার হাজার সাধারণ মানুষ বৈধ উপায়ে আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছেন।
চার্টার্ড ফ্লাইট ও ‘ডিপোর্টেশন’
বিশ্বজুড়ে অভিবাসন আলোচনায় সম্প্রতি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, তা হলো আমেরিকা থেকে বিশেষ চার্টার্ড (এবং এমনকি সামরিক) বিমানে অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনা। সংবাদমাধ্যমে শত শত মানুষের হাতকড়া পরা অবস্থায় ফিরে আসার ছবি দেখে স্বাভাবিকভাবেই ভয়ের সঞ্চার হয়। অনেকে এটিকে ভিসা নীতির নেতিবাচক প্রভাব মনে করেন। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া এবং মার্কিন ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্টের কঠোর প্রয়োগ। করোনা মহামারীর সময় জনস্বাস্থ্যের নামে চালু ‘টাইটেল ৪২’ বিধি ২০২৩ সালের মে মাসে উঠে যায়। অনেকে ভেবেছিলেন সীমান্ত উন্মুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে টাইটেল ৪২ উঠে যাওয়ার পর মার্কিন প্রশাসন পুরনো ও কঠোর আইন ‘টাইটেল ৮’-এর প্রয়োগ আরও জোরদার করে। এই আইনের অধীনে অবৈধ প্রবেশকারীদের শুধু ফেরত পাঠানো হয় না, বরং আইনি ব্যবস্থা নিয়ে অন্তত পাঁচ বছরের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়
ডিপোর্টেশন বা ফেরত পাঠানোর এই বিষয়টি যে কেবল বাংলাদেশ বা ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে ঘটছে, তা ভাবলে ভুল হবে। বরং বিশ্বশক্তি হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর নাগরিকরাও এই কঠোর আইনের সম্মুখীন হচ্ছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভারত।
খুব সম্প্রতি, ২০২৪ সালের শেষের দিকে, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) একটি বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে ফেরত পাঠিয়েছে। এটি ছিল একটি নজিরবিহীন ঘটনা। মার্কিন শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা (CBP)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৯০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ ভারতীয় নাগরিক মেক্সিকো ও কানাডা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। বন্ধুপ্রতিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকা সত্ত্বেও আমেরিকা অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্নে ভারতকে কোনো ছাড় দেয়নি। ভারতীয় নাগরিকদের এই গণহারে ফেরত পাঠানো প্রমাণ করে যে, মার্কিন ইমিগ্রেশন আইন কোনো বিশেষ দেশের প্রতি নমনীয় বা কঠোর নয়, বরং এটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। মেক্সিকো, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, হাইতি, ভেনিজুয়েলা এবং কলম্বিয়া থেকে প্রতি সপ্তাহে ডজন ডজন ফ্লাইট ভর্তি করে মানুষকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর বার্ষিক রিপোর্ট বলছে, গত এক বছরে তারা প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার মানুষকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। এই তালিকায় এশীয়, আফ্রিকান এবং ইউরোপীয়- সব অঞ্চলের নাগরিকই রয়েছেন।
কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে
ফেরত আসা অধিকাংশই অবৈধভাবে (মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে) প্রবেশকারী, যারা পরে অ্যাসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) আবেদন করেছেন। মার্কিন আইন অনুসারে, নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে এলে আশ্রয়ের যোগ্যতা আছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কারণে আসা হয়, যা আশ্রয়ের যোগ্য নয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া (সাক্ষাৎকার, যাচাই-বাছাই, বিচারকের সিদ্ধান্ত) শেষে দাবি মিথ্যা/ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে ডিপোর্টেশন অর্ডার হয়। এটি বাছবিচারহীন নয়, বরং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল।
স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি
এই কঠোরতার পেছনে রয়েছে মানবিক ট্র্যাজেডি। ফেরত আসা মানুষেরা প্রায়ই গ্রামের জমি বিক্রি করে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ৩০-৪০ লাখ টাকা (কখনও বেশি) খরচ করেছেন দালালের হাতে। ফিরে আসার পর পকেট শূন্য, ঋণের বোঝা কাঁধে, সমাজের কটাক্ষ ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাদের গ্রাস করে। মার্কিন প্রশাসন বারবার সতর্ক করে : ‘সীমান্ত অবৈধদের জন্য বন্ধ, দালালের কথায় বিশ্বাস করবেন না।’ তথ্যের অভাব ও দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন মানুষকে অন্ধ করে, যার মাসুল জীবন ও সম্পদ দিয়ে দিতে হয়।
মার্কিন পালাবদল ও ভবিষ্যৎ
আমেরিকার ভিসা বা অভিবাসননীতি স্থির নয়। এটি ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি- বিশেষ করে হোয়াইট হাউসে কোন দল ক্ষমতায় আছে- এর ওপর নির্ভর করে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের নীতি সম্পূর্ণ বিপরীত।
ট্রাম্প বনাম বাইডেন : বাইডেনের ডেমোক্র্যাট প্রশাসন (২০২১-২৪) অভিবাসনে মানবিক ও উদার ছিল- পারিবারিক পুনর্মিলন, অনিবন্ধিত অভিবাসীদের নাগরিকত্ব সুযোগ এবং শরণার্থীদের আশ্রয়ের পক্ষে। তবে সীমান্তে অভিবাসীদের ঢল নামায় তারাও কঠোর হয়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান প্রশাসন (২০২৫-বর্তমান) ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী। তাদের অবস্থান স্পষ্ট : সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ, অবৈধ অভিবাসন শূন্যে নামানো এবং ভিসা প্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাই (যেমন- সোশ্যাল মিডিয়া ভেটিং ‘anti-American’ কনটেন্টের জন্য)। তারা মনে করে, অবাধ অভিবাসন আমেরিকানদের চাকরি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
বর্তমান পরিবর্তন (২০২৫-২০২৬) : ট্রাম্পের দ্বিতীয় টার্মে (২০২৫ সালে ক্ষমতায় আসার পর) অভিবাসন প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন ঘটেছে। ট্রাভেল ব্যান ১৯ দেশে (যেমন- আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া, বুর্কিনা ফাসো) বিস্তারিত হয়েছে, রিফিউজি প্রোগ্রাম সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং ডিপোর্টেশন রেকর্ড লো (৩ লাখ+ ২০২৫ সালে)। H-1B ভিসার কড়াকড়ি বেড়েছে (যেমন- জানুয়ারি ২০২৬ থেকে নতুন রেস্ট্রিকশন কার্যকর), গ্রিন কার্ডের অপেক্ষা দীর্ঘতর হয়েছে। পারিবারিক ভিসা (‘চেইন মাইগ্রেশন’) কমেছে, মেধাভিত্তিক অভিবাসনকে জোর দেওয়া হয়েছে। এই নীতিগুলো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়- ভারত, মেক্সিকো, ফিলিপাইন বা বাংলাদেশের জন্য সমান প্রযোজ্য। এটিকে অপমান হিসেবে না দেখে প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখুন। বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যারা নিজেদের দক্ষ করে তুলবেন, আগামীর আমেরিকায় তারাই টিকে থাকবেন।
বৈশ্বিক স্রোতেরই অংশ বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক অভিবাসনের বিশাল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন নয়। বিশ্বজুড়ে অভিবাসন নিয়ে যা ঘটছে, বাংলাদেশেও তার প্রতিফলন। চায়ের আড্ডা বা রাজনৈতিক আলোচনায় ‘মার্কিন ভিসা নীতি’ নিয়ে ঝড় উঠলেও এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ক্ষুদ্র অংশ।
শিক্ষার্থীদের রেকর্ড ব্রেকিং সাফল্য : ভয়ের বিপরীতে সম্ভাবনার চিত্র : ভিসা নীতি নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা চললেও পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কূটনৈতিক টানাপড়েন বাংলাদেশি মেধাবীদের আটকাতে পারেনি। IIE-এর Open Doors 2025 Report অনুসারে, ২০২৪/২৫ একাডেমিক ইয়ারে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা রেকর্ড ভেঙেছে- প্রায় ১৫,৩৫৭ (১৫.৫% বৃদ্ধি), যা এশিয়ায় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির একটি। বর্তমানে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউটি কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো তরুণ গবেষক এখন আমেরিকার নামিদামি ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করছেন।
এই পরিসংখ্যানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ নাগরিকদের জন্য, বিশেষ করে মেধাবীদের জন্য দুই দেশের সম্পর্ক ও সুযোগ আগের মতোই স্বাভাবিক। ভিসা নীতি যদি ঢালাওভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য হতো, তবে এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভিসা পেতেন না। অর্থাৎ যোগ্যতা থাকলে রাজনীতির মারপ্যাঁচ কোনো বাধা নয়।
ফেরত আসা এবং সামাজিক সচেতনতা : সম্প্রতি যেসব বাংলাদেশি নাগরিক বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন, তাদের ঘটনাটি আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে মনে রাখা জরুরি, তারা কোনো বিশেষ ‘রাজনৈতিক আক্রোশের’ শিকার হননি। তারা সেই বৈশ্বিক ‘ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট’ বা আইন প্রয়োগ প্রক্রিয়ারই শিকার, যা আমরা ভারত, চীন বা ল্যাটিন আমেরিকার নাগরিকদের ক্ষেত্রেও দেখেছি।
যারা ফেরত এসেছেন, তারা মূলত দালালদের প্রলোভনে পড়ে বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিলেন। আইনি লড়াইয়ে তাদের ‘অ্যাসাইলাম’ বা আশ্রয়ের আবেদন টেকেনি বলেই তাদের ফিরতে হয়েছে। এটি দেখিয়ে দেয় যে, শর্টকাট পথের দিন শেষ। জমি বিক্রি করে ৩০-৪০ লাখ টাকা দালালকে দেওয়ার আগে দশবার ভাবুন- শেষ গন্তব্য জেল বা শূন্যহাতে ফেরত।
স্বাভাবিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির সমীকরণ : দিনশেষে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক এবং গভীর। বাংলাদেশ তার তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় অংশ রপ্তানি করে আমেরিকায়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সন্ত্রাসবাদ দমন, স্বাস্থ্য খাত এবং উন্নয়ন সহযোগিতায় দুই দেশ দীর্ঘদিনের অংশীদার। ভিসা নীতি বা ইমিগ্রেশন কড়াকড়ি নির্দিষ্ট কিছু আইনি কাঠামোর বিষয়। এর প্রভাব দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের ওপর পড়ার কথা নয়, যদি না তারা নিজেরা কোনো আইন ভঙ্গ করে।
আবেগের চেয়ে বাস্তবতা জরুরি
আমেরিকা আজও বিশ্বের কোটি কোটি তরুণের স্বপ্নের গন্তব্য। এই স্বপ্ন দেখা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে পা বাড়ানোর আগে বাস্তবতাকে চিনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, মার্কিন ভিসা নীতি বা নিষেধাজ্ঞাকে ‘ভয়’ হিসেবে না দেখে, এটিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখুন। পৃথিবীজুড়ে যে নিয়ম চলছে- নাইজেরিয়া থেকে নিকারাগুয়া, ভারত থেকে মেক্সিকো- আমরাও তার বাইরে নই।
দ্বিতীয়ত, দালালদের অপপ্রচারে কান দেওয়া বন্ধ করুন। ‘বর্ডার খোলা’ বা ‘সবার ভিসা হচ্ছে’- এগুলো নিছক গুজব। ২০২৫-২৬ সালে আমেরিকার ইমিগ্রেশন আইন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠোর এবং প্রযুক্তিনির্ভর (ড্রোন, AI-ভিত্তিক সার্ভেইল্যান্স, সোশ্যাল মিডিয়া ভেটিং)। দরিয়ান গ্যাপ ক্রসিং ৯৯.৯৮% কমে যাওয়া এর প্রমাণ। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলা। আজকের বিশ্বায়িত যুগে আমেরিকা সস্তা শ্রমিকের সন্ধানে নেই; তারা খুঁজছে দক্ষ জনশক্তি বা ‘স্কিলড ম্যানপাওয়ার’। আপনি যদি দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষক, ডাক্তার বা আইটি বিশেষজ্ঞ হন, তাহলে ভিসা নীতি আপনার জন্য বাধা নয়।
ডাংকি রুটের মরণফাঁদ
বৈধ ভিসা প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ মনে হলে অনেকে অবৈধ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন- যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘দ্য ডাংকি রুট’ (The Donkey Route) নামে পরিচিত। এটি এখন কেবল একটি অভিবাসন রুট নয়, বরং এক বৈশ্বিক মানবিক সংকট।
দরিয়ান গ্যাপ : আমেরিকায় অবৈধ প্রবেশের প্রধান পথ দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার সংযোগস্থল দিয়ে। কলম্বিয়া-পানামা সীমান্তের ‘দরিয়ান গ্যাপ’ প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ঘন অরণ্য- কোনো রাস্তা নেই, কেবল কাদা, পাহাড়, খরস্রোতা নদী, বিষধর সাপ ও বন্যপ্রাণী। প্রকৃতির চেয়ে বড় ভয় মানুষের- ডাকাতি, নির্যাতন ও মানবপাচার। IOM ও UNHCR-এর রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৩ সালে রেকর্ড ৫২০,০০০+ অভিবাসী এই জঙ্গল পাড়ি দিয়েছেন। ২০২৪ সালে সংখ্যা কমে ৩০২,০০০-এ নেমেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির প্রভাবে সংখ্যা বিশালভাবে হ্রাস পেয়েছে- জানুয়ারি-মার্চে মাত্র ২,৮৩১ জন এবং মে-জুন মাসে মাত্র ১৩-১০ জন! এটি ৯৯.৯৮% কম।
দালালদের হাই-টেক ফাঁদ : মানবপাচারকারী চক্র এখন গ্রামীণ টাউট নয়- আন্তঃমহাদেশীয় সিন্ডিকেট। দুবাই, ইস্তাম্বুল, সাও পাওলো, বোগোতা থেকে মেক্সিকো সিটি পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা টিকটক, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামে মিথ্যা ভিডিও ছড়ায়- দেখায় সহজে বর্ডার পার হয়ে নিউইয়র্কে ঘুরে বেড়ানো। গুজব ছড়ানো হয় : ‘নির্বাচন আসছে, বর্ডার খোলা’ বা ‘সবাইকে ওয়ার্ক পারমিট দিচ্ছে’। এতে সহজ-সরল মানুষ ও শিক্ষিত যুবকও ফাঁদে পড়েন। দক্ষিণ আমেরিকা পৌঁছলে দালালরা অভিবাসীদের স্থানীয় মাফিয়া/কার্টেলের হাতে তুলে দেয়। টাকা দাবি, না দিলে নির্যাতন। জঙ্গলে ডাকাতি, লুটপাট, নারীদের যৌন সহিংসতা। খাবার-পানির অভাব, অসুস্থতায় শত শত মানুষ মারা যায়- লাশের হদিস মেলে না। IOM অনুসারে, ২০১৫-২০২২ পর্যন্ত কমপক্ষে ৩১২ জন মৃত/নিখোঁজ; ২০২৪-এর মতো বছরে মৃত্যু আরও বেড়েছে।
সীমান্তের দেয়াল ও স্বপ্নভঙ্গ : যারা জঙ্গল পার হয়ে মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছেন, তাদের জন্য অপেক্ষা অত্যাধুনিক সীমান্ত নিরাপত্তা- ড্রোন, সেন্সর, ইনফ্রারেড ক্যামেরা, হাজারো বর্ডার প্যাট্রোল। অধিকাংশ ধরা পড়েন, ডিটেনশন সেন্টারে অমানবিক অবস্থায় আটক। অ্যাসাইলাম কেস না টিকলে হাতকড়া-পায়ে বেড়ি পরিয়ে চার্টার্ড বিমানে ফেরত।
অর্থনৈতিক হাহাকার : একজন অভিবাসী যখন ‘ডাংকি’ রুটে যাত্রা শুরু করেন, তখন তিনি কেবল নিজের জীবন বাজি রাখেন না, বরং পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ বাজি রাখেন। এই যাত্রায় একেকজনের খরচ হয় বাংলাদেশি টাকায় ২০ থেকে ৪০ লাখ, ভারতীয়দের ক্ষেত্রে রুপিতে ৩০-৫০ লাখ এবং চীনাদের ক্ষেত্রে আরও বেশি। এই বিপুল অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ গ্রামের শেষ সম্বল ধানি জমিটুকু বিক্রি করেন, কেউ চড়া সুদে ঋণ নেন। যখন এই মানুষগুলো শূন্যহাতে দেশে ফেরত আসেন, তখন তাদের সামনে অপেক্ষা করে এক ভয়াবহ অন্ধকার। ঋণের বোঝা, সমাজের কটাক্ষ এবং মানসিক ট্রমা তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। অথচ দালালরা ঠিকই তাদের পকেট ভারী করে নতুন শিকারের সন্ধানে নেমে পড়ে। বিশ্বজুড়ে এই মানবপাচার এখন বিলিয়ন ডলারের অবৈধ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
অবৈধ পথের অন্ধকারে বৈধ অভিবাসনের আলোর রেখা
এতক্ষণ আমরা অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি, জীবনহানি এবং ফেরত আসার করুণ চিত্র দেখেছি। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে এক উজ্জ্বল বাস্তবতা। আমেরিকা অভিবাসীদের দ্বারা এবং অভিবাসীদের জন্যই গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক টানাপড়েন বা সীমান্ত কড়াকড়ি থাকলেও দেশটি কখনও মেধা ও যোগ্যতার দরজা বন্ধ করেনি। বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ধরে রাখতে আমেরিকার এখনও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদেশি মেধাবীদের বা ‘ব্রেন’।ক্ষার্থীদের জয়জয়কার : পরিসংখ্যান কী বলছে? বিশ্বজুড়ে ভিসা নীতি নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা চললেও আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। IIE-এর Open Doors 2025 Report অনুসারে, ২০২৪/২৫ একাডেমিক ইয়ারে মোট ১.২ মিলিয়ন (১,১৭৭,৭৬৬) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ৫% বৃদ্ধি। এটি সর্বকালের সর্বোচ্চ।
এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারত ও চীন। ভারত থেকে ৩৬৩,০১৯ শিক্ষার্থী (১০% বৃদ্ধি), চীন থেকে ২৬৫,৯১৯ (৪% হ্রাস)। বাংলাদেশ, নেপাল, ভিয়েতনাম, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ থেকেও প্রবাহ বাড়ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কূটনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা এই মেধাবীদের পথ রুদ্ধ করতে পারেনি।
আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈচিত্র্যে (ডাইভারসিটি) বিশ্বাস করে। হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড থেকে স্টেট ইউনিভার্সিটি- সবাই যোগ্য শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ, ফেলোশিপ ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দিতে কার্পণ্য করে না। সঠিক কাগজপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ভাষার দক্ষতা (IELTS/TOEFL) থাকলে ভিসা পাওয়ার হার এখনও সন্তোষজনক। এটি প্রমাণ করে যে, আমেরিকা দরজা বন্ধ করেছে কেবল আইন অমান্যকারীদের জন্য; নিয়ম মেনে চললে লাল গালিচা এখনও পাতা।
সিলিকন ভ্যালি থেকে ওয়াল স্ট্রিট : দক্ষ পেশাজীবীদের রাজত্ব আমেরিকার প্রযুক্তি ও করপোরেট জগত অনেকাংশে দক্ষ অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল। সিলিকন ভ্যালিতে গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, আইবিএম-এর শীর্ষ পদে রয়েছেন এশীয় বংশোদ্ভূত বা অভিবাসীরা।
এইচ-১বি (H-1B) ভিসা দক্ষ পেশাজীবীদের কাজ করার প্রধান মাধ্যম। প্রতিবছর আবেদন কোটার কয়েক গুণ বেশি হয়। আমেরিকা প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের স্বার্থে বিশ্বের সেরা প্রকৌশলী, ডাক্তার, বিজ্ঞানীদের গ্রিন কার্ড দিয়ে বরণ করে। সম্প্রতি ‘স্টেম’ (STEM- Science, Technology, Engineering, Mathematics) ফিল্ডে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য OPT মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, নিজেকে দক্ষ করে তুললে আমেরিকার শ্রমবাজারে আপনার চাহিদা আকাশচুম্বী। জাতীয়তা বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়- দক্ষতা (স্কিল) মুখ্য।








































