আবু হেনা মোস্তফা জামাল।।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট গঠন-ভাঙন নতুন কিছু নয়। তবে কিছু জোট থাকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। আর কিছু জোট সৃষ্টি হয় নিজস্ব সত্ত্বা আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে। জামায়াত জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র যোগদান নিয়ে তাই আলোচনা তুঙে। এই জোটে যাওয়া নয়া দলটির আত্মবিসর্জন নাকি ঐতিহাসিক। তা নিয়ে কথা খুব হওয়ার কথা নয়। যেখানে আদর্শ নয়, টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা মুখ্য হয়ে ওঠে- সেখানে আত্মবিসর্জনের বিষয়টিই সামনে আসে।
তরুনদের নিয়ে এনসিপি আত্মপ্রকাশ হয়েছিল কথিত “নতুন ধারার রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বছরের শুরুর দিকে এ বছর মার্চে এ নিয়ে এক লেখায় প্রশ্ন রেখেছিলাম- ডান, মৌলবাদী ও বামপন্থী দর্শেনর সবাইকে নিয়ে কি একটি রাজনৈতিক দল সফল হতে পারে কি? তাই সংগত কারণেই ১০ মাস পরে এই লেখা লিখতে হচ্ছে। এনসিপি, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, আধুনিক গণতন্ত্র, মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দর্শন সব মিলিয়ে তারা নিজেদের উপস্থাপন করেছিল পুরোনো ধারার বিকল্প হিসেবে। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতির ওপর যেন নিজেরাই মাটি চাপা দিল দলটি। যা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু প্রশ্ন রেখেছিলাম, তাই কেন এই পরিণতি তার ব্যাখ্যা দেওয়াও প্রয়োজন।
আদর্শ আর নির্বাচনে আসন সমীকরণের আত্মসমর্পণ হলো নতুন এই জোট বদ্ধতা। রাজনীতিতে আদর্শ আর বাস্তবতার দ্বন্দ্ব চিরকালীন। কিন্তু এনসিপির ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব নয়, বরং আদর্শের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ দেখা যাচ্ছে। জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুস্পষ্ট দক্ষিণপন্থি, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি। তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান এবং রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। এর মধ্যে দিয়ে এনসিপি যে দাবি করেছিল, তারা মধ্য পন্থার দল হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে, সেই স্বপ্নের সমাপ্তির শুরু হলো। ইতোমধ্যেই এই সিদ্ধান্তে দলের মধ্যে তুলনামূলক প্রগতিশীল গোষ্ঠী দলটি ত্যাগ করতে বা দলের সাথে প্রচ্ছন্ন দূরত্ব রাখতে শুরু করেছেন।
দলটির আদর্শের সংকটের কারেনই শুরুতেই দল গঠনে এনসিপি হোচোট খেয়েছে। দল গঠনের ১০ মাসেরও তরুণদের আকৃষ্ট করতে অসমর্থ হয়েছে দলটি। বরং বিভিন্ন সময়ে সমাজের কলুষিত মানুষেরা ধীরে ধীরে ভিড় করছে এই দলে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের যে তরুণেরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল, তারা কেন এই দলটির ওপর আস্থা রাখতে পারেনি, এটি ক্রমশ স্পষ্ট। তখন বলা হচ্ছিল, এই দলের মধ্যে দক্ষিণ পন্থার প্রভাব বেশী। জামায়াতসহ ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক দলগুলির জোটে যোগদানের ঘোষণার পর এনসিপিকে আর আলাদা করে ‘নতুন’ বলা যায় কী? নাকি তারা পরিণত হলো পুরোনো রাজনীতির আরেকটি ক্লোনে? এ প্রশ্ন করতেই পারি।
এই জোট ভুক্তির মাধ্যমে দলটি ক্রমশ অকার্যকর হয়ে পড়বে আশঙ্কা করি। কারণ জোট রাজনীতিতে ছোট দল প্রায়ই বড়ো দলের ছায়ায় হারিয়ে যায়। জামায়াতের মতো সাংগঠনিকভাবে শক্ত কট্টর দলের পাশে এনসিপির ভবিষ্যৎ খুব সহজেই অনুমেয়। জোটের সিদ্ধান্ত আসবে জামায়াতের আদর্শিক কাঠামো থেকেই। এনসিপি সেখানে থাকবে কেবল সমর্থকের ভূমিকায়। এনসিপির যে সীমিত মধ্যবিত্ত, তরুণ ও আধুনিক চিন্তাধারার সমর্থক ছিল, তারা এই জোটে স্বস্তি খুঁজে পাবে না। ফলাফল নীরব প্রস্থানে দলটিকে ভেতর থেকে আরও ফাঁপা করে তুলবে। এভাবে যদি কয়েক বছর যায় তাহলে এনসিপিকে আর আলাদা করে চিহ্নিত সম্ভব হবে না। দলটি পরিচয় হবে জামায়াত জোটের একটি শরিক দল হিসেবে। এই প্রক্রিয়ায় এনসিপি ধীরে ধীরে একটি অকার্যকর, নামমাত্র রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
এবার একটু দেখি এর মধ্যদিয়ে দেশে দক্ষিণপন্থি রাজনীতিক দলগুলি কীভাবে উত্থানের অনুকূল পরিবেশ পায় সেটি। এনসিপি মধ্যপন্থার দল হিসেবে গড়ে উঠতে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকার পরেও যখন দক্ষিণপন্থী জোটে যুক্ত হয়, তখন সেটি কেবল একটি দলের সিদ্ধান্ত থাকে না, তা একটি রাজনৈতিক বার্তা হয়ে ওঠে। এর বার্তাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চেষ্টা করবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলি। ফলে বার বার স্বপ্ন দেখে ধোঁকা খাওয়া মানুষেরা উদার ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি বিরূপ হতে পারে এবং এসব দল গুলির কণ্ঠ আরও দুর্বল হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এখনও ভোটারদের দলে টানতে মধ্যেপন্থার দলগুলি ও দক্ষিণপন্থিদের কণ্ঠে কন্ঠ মেলাতে শুরু করেছে যা আমরা বিগত কয়েকদিনের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে দেখতে পাচ্ছি।
জামায়ত জোটে এনসিপির যাওয়ায় কেবল মাত্র এনসিপির নয়, নতুন ধারার রাজনীতির সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি হলো। যা হয়ত এখনই দেখা যাবে না। কিন্তু ভবিষ্যতের নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগগুলো ভয় পাবে। যারা সত্যিকারের বিকল্প রাজনীতি গড়তে চায়, তারা প্রথমবে ভাবতে বাধ্য হবে শেষ পর্যন্ত সবাইকে পুরোনো শক্তির কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে কি না । দেশে আদর্শ নিয়ে রাজনীতি টেকসই নয় এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুনদের জায়গা নেই। ফলে নতুন ধারার রাজনীতির যে সম্ভাবনা বাংলাদেশে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এনসিপি ইনিয়ে বিনিয়ে বলবার চেষ্টা করছে, জোট রাজনৈতিক, কৌশলগত, আদর্শিক নয়। কিন্তু আসলেই কি তাই? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের বহুল প্রচলিত সেই উপমা “কাদম্মবিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে, সে মরে নাই”; তেমনই জামায়াত, ধর্ম নির্ভর রাজনৈতিক দলের জোটে যোগদানের মাধ্যমে এনসিপি প্রমাণ করলো কেবল নাম বদল করে একটি রাজনৈতিক একটি দল হলেও তারা তাদের পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবকদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয় না। দক্ষিণপন্থাতেই তারা আছে, এর আগে জনগণের সামনে যা বলেছ তা ধোঁকা মাত্র।
তারপর আবারও বলি দীর্ঘমেয়াদে এটি এনসিপির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে তাদের আদর্শ বিচ্যুতির রাজনীতির পথচলা শুরু। আদর্শহীন রাজনীতি হয়ত কয়েকটি আসন এনে দিতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে কোনো সম্মানজনক স্থান দেয় না। এর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থার উত্থান, নতুন ধারার রাজনীতির সংকোচন এবং এনসিপির সম্ভাব্য অকার্যকর হয়ে পড়া ইতিহাস। সবকিছু মিলিয়ে এই জোট ভবিষ্যতে একটি রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের উদাহরণ হিসেবেই আলোচিত হবে ভবিষ্যতে।
রাজনীতিতে কখনো চুপ করে একা দাঁড়িয়ে থাকা, একা প্রতিবাদ করাও একটি অবস্থান। কিন্তু ভুল পাশে দাঁড়ানো ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না। যে ভুলের ইতিহাস এই জোটের প্রধান দলটির রয়েছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী










































