Home আঞ্চলিক উপকূলে পানির জন্য সংগ্রাম: উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ

উপকূলে পানির জন্য সংগ্রাম: উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ

16


মোরেলগঞ্জ প্রতিনিধি।।
নদীর নাম পানগুছি। দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে এই নদী। একসময় পানগুছির জল ভেঙে সওদাগরী নৌকা ভিড়ত মোরেলগঞ্জের মোহনায়। এভাবেই পল্লি বাংলার এ অঞ্চলটি হয়ে ওঠে গঞ্জ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন ও লবণাক্ত পানির প্লাবনে মোরেলগঞ্জের হাজারো পরিবার আজ ঘরছাড়া। ভিটে মাটি হারিয়ে অনেকেই হয়েছেন উদ্বাস্তু। যারা থেকে গেছেন, তাদের জীবন হয়ে উঠেছে চরম দুর্বিষহ।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাবতলা গ্রামে গিয়ে কথা হয় ‘মা সংসদ’ এর মমতাজ বেগম, ‘স্বাস্থ্যগ্রাম’ দলের জান্নাতুল বুশরা, নূর জাহান বেগম, গফফার তালুকদার, সাবেক ইউপি সদস্য মো. নুরুল ইসলাম, আল আমিন মিরাজ, মো. আলি বিশ্বাসসহ অনেকের সঙ্গে। তারা জানান, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করেন তারা। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের এসব কর্মকর্তা সমস্যার কথা মন দিয় শোনেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয় না। এজন্য বাজেট স্বল্পতাকে দায়ী করেন তারা।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিনিয়ত ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের পাশাপাশি জোয়ারের লোনা পানি প্রবেশ করছে এই জনপদে। এতে নিরাপদ পানিসহ ফসলি জমি, নারিকেল-সুপারির বাগানসহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান। এর ফলে স্থানীয়রা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দারিদ্র্য বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান সংকট সৃষ্টি হওয়ায় অনেকেই জীবিকার তাগিদে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

এলাকাবাসীর প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে লবণাক্ত পানি থেকে রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু সহনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তাদের মতে, এসব দাবি বাস্তবায়িত হলে উপকূলের মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে পাবে।

স্থানীয়রা জানান, আগে তারা নদীর পানি পান করেই জীবনধারণ করতেন। বর্ষাকালে নদীর পানিতে লবণাক্ততা কম থাকলেও সেই পানি পানের কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, নিউমোনিয়া ও জন্ডিসের মতো রোগবালাই লেগে থাকত। তখন খোলা জায়গায় শৌচকাজ সারা হতো, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস ছিল না, পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতাও ছিল কম। অসুস্থ হলে ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে ওষুধ বা স্বাস্থ্যকর্মী পাওয়া যেত না; গ্রামের ওষুধের দোকানই ছিল একমাত্র ভরসা।

এ প্রেক্ষাপটে হেলভেটাস বাংলাদেশ অর্থায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডরপ-অ্যাকশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন্সুরিং সাসটেইনেবল সলিউশন (এক্সেস) প্রকল্পের মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে বিভিন্ন সিএসও এবং সিবিও, বিশেষ করে ওয়াশ বাজেট মনিটরিং ক্লাব, মা সংসদ এবং স্বাস্থ্যগ্রাম দলকে বিভিন্ন ধরনের সক্ষমতার ওপর প্রশিক্ষণ দেয়। যার মাধ্যমে সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন সময় এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পিটিশন এবং অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে খাস পুকুরগুলোকে নিরাপদ পানি ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিক ট্যাংক, পুরোনো পিএসএফ সংস্কার করে উপকূলবাসীর পানির সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া প্রতি বছর ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট বৃদ্ধিতে সিএসও এবং সিবিওরা ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় উপজেলা মোরেলগঞ্জ, পাইকগাছা এবং কয়রার ১৫টি ইউনিয়নের পানি, স্যানিটেশন এবং জলবায়ু বাজেট বেড়েছে।

পরির্বতনজনিত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য উপস্থাপন করতে পারি এবং উপজেলা প্রশাসন বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিচ্ছে। কিন্তু বাজেট সীমাবদ্ধতায় প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। এরই মধ্যে আমরা মা সংসদ উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি ও বিষয়ভিত্তিক পিটিশন দাখিলের মাধ্যমে এলাকায় বেদখল হওয়া দুটি সরকারি খাসপুকুর জনগণের নিরাপদ পানির সংকট কমাতে উপজেলা প্রশাসন থেকে অনুমোদন করিয়েছি। পাশাপাশি এলাকার মিষ্টি পানির উৎসগুলো রক্ষায় নীতিনির্ধারক দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মানববন্ধন করার মাধ্যমে খাউলিয়া ইউনিয়নের পশুরবুনিয়া গ্রাম থেকে বহরবুনিয়ার ইউনিয়নের ঘোশিয়াখালী গ্রাম পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য নদী শাসনের কাজ শুরু করানো হয়েছে।’

ওয়াশ বাজেট মনিটরিং ক্লাবের সহসভাপতি মো. আবু সালেহ বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে বারইখালী ও বহরবুনিয়ার ইউনিয়নের মধ্যে সংযোগ স্থাপনাকারী বারইখালী-কাটাখাল কালভার্টটি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য মানববন্ধন ও পিটিশন দাখিলের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি আমলে নিয়ে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়।’

বেসরকারি সংস্থা ওয়াটারএইডের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুই কোটির বেশি মানুষ এখনো নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। প্রতি বছর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার অভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী অন্তত ৪ হাজার ১০০ শিশুর মৃত্যু হয়।

নিরাপদ পানির তীব্র সংকটে উপকূলীয় মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠছে বৃষ্টির পানি। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ নানা উপায়ে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে সারা বছর ব্যবহার করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদভাবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও ব্যবহার করলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়।

উপকূলের আরেক জনপদ খুলনা জেলার কয়রা উপজেলা। উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, এলাকার প্রায় সব জলাশয়ের পানি পানযোগ্য নয়। দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত থাকছেন এ অঞ্চলের বাসিন্দারা। এখানে প্রকল্পের আওতায় ৫ ডিসেম্বর উত্তর মদিনাবাদ এলাকায় কথা হয় মো. মনিরুজ্জামান, লাইলী বেগম, হালিমা খাতুন, মমতাজ, মনোয়ার খাতুন, সহিল উদ্দিন খান, সুমি বেগম, আসিয়া খাতুন, রেজাউল করিম ও আনিসুর রহমানের সঙ্গে। তারা জানান, একসময় ফিটকিরি দিয়ে পুকুরের পানি পান করতে হতো। তখন ঘরে ঘরে রোগব্যাধি লেগেই থাকত। পরে দূরে একটি নলকূপ স্থাপন করা হলে সেখান থেকে পানি আনতে হতো। কিন্তু বছরের ছয় মাসের বেশি সময় দুর্গম কর্দমাক্ত পথে হেঁটে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগত, যা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।

আসিয়া খাতুন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলার পর পুরো এলাকার পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। তখন পুকুরের পানি খেয়ে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশা, ঘা-পাঁচড়াসহ নানা রোগে ভুগেছি। লবণাক্ততার কারণে মেয়েদের অনিয়মিত মাসিকও সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসার পেছনে মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হতো। ডরপ এবং হেলভেটাসের সহযোগিতায় বাড়ির পাশে একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করায় এখন পানির কষ্ট অনেকটাই কমেছে।’

খুলনার আরেক উপকূলীয় উপজেলা পাইকগাছা। উপজেলার গড়ইখালী ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, কয়রা ও মোরেলগঞ্জের মতো এখানকার জীবনযাপনও প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের যুদ্ধ। পানযোগ্য পানির সংকট, দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত পানির অভাব, দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি প্রবেশ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার অনিরাপত্তা সব মিলিয়ে জীবন হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় গৃহিণী মাহফুজা বেগম বলেন, ‘আগে পুকুরের পানি খাওয়ার কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশা আর চুলকানি লেগেই থাকত। এখন এসব সমস্যা অনেকটাই কমেছে।’ তবে তিনি স্বাস্থ্যসেবার সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘দুটি ইউনিয়নের মানুষের জন্য মাত্র একটি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার রয়েছে, সেখানে নেই কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক বা পর্যাপ্ত ওষুধ।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী খানজাহান আলী বলেন, ‘আগে সবাই কাঁচা পায়খানা ব্যবহার করত। এখন স্ল্যাব পায়খানা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে সেগুলো প্রায়ই ভেঙে যায় বা তলিয়ে যায়। তখন ভোগান্তির শেষ থাকে না।’

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এলাকায় পানি ও স্যানিটেশন সমস্যা সমাধানে সিএসও এবং সিবিও প্লাটফর্মগুলো ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট বৃদ্ধি ও বরাদ্দ নিয়ে নিয়মিত অ্যাডভোকেসি করার মাধ্যমে বিদ্যমান পানি স্যানিটেশন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও সমস্যাগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো।