Home আঞ্চলিক চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ঘেরে কাটা শ্যাওলার ব্যবহার

চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ঘেরে কাটা শ্যাওলার ব্যবহার

118


বাগেরহাট প্রতিনিধি।।

উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে চিংড়ির রোগবালাই এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিংড়ি চাষ করতে গিয়ে বছরের পর বছর সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে অনেক চাষি। এ কারণে বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের একদল বিজ্ঞানী, চিংড়ি ঘেরে কাটা শ্যাওলার উপস্থিতিতে ৩ বছর ধরে গবেষণা করে আসছেন।


বিজ্ঞানীরা বলছেন, চিংড়ি ঘেরে কাটা শ্যাওলার উপস্থিতিতে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করে না বরং এটি চিংড়ির শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। কাঁটা শ্যাওলা একটি জলজ উদ্ভিদ, যা স্থানীয়ভাবে ‘লক্ষ্মী শ্যাওলা’ নামেও পরিচিত। উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসছেন যে, ঘেরে কাঁটা শ্যাওলা থাকলে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বাড়ে। এ বিশ্বাস যে শুধুই ধারণা তা নয়, তার প্রমাণ দিয়েছেন চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের একদল বিজ্ঞানী।

গবেষণায় দেখা গেছে, চিংড়ির ঘেরে কাঁটা শ্যাওলার উপস্থিতি শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, বরং এটি চিংড়ির শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয় এবং পরিবেশে থাকা ক্ষতিকর জীবাণু থেকেও সুরক্ষা প্রদান করে। গত ৩ বছর গবেষণা শেষে চাষি পর্যায়ে এর উপযোগিতা নিরূপণেও দেখা যায়, চিংড়ি ঘেরের মোট যায়গার ২০% জুড়ে কাঁটা শ্যাওলা রাখলে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন দ্বিগুণ হয় এবং চিংড়ি বিভিন্ন রোগ-বালাই থেকে মুক্ত থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ ঘেরে সনাতন এবং উন্নত সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। তাই এসব পদ্ধতির প্রচলিত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মানোন্নয়ন করা গেলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন এসব বিজ্ঞানীরা।

তিন সদস্য দলের প্রধান গবেষক ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম তানবিরুল হক বলেন, ‘চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে মাটি ও পানির ভৌত রাসায়নিক গুণাগুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। চিংড়ির পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য পানি থেকেই মূলত তারা খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। মাটি পানিকে ধরে রাখে এবং পানিতে চিংড়ির প্রাথমিক খাদ্য তৈরির জন্য যাবতীয় পুষ্টি উপাদান মাটি থেকে পানিতে অনবরত মিশে থাকে। তাই পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং চিংড়ির স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধিতে মাটি ও পানির ভৌত রাসায়নিক গুণাগুণ যৌথভাবে ভূমিকা পালন করে থাকে। কাজেই মাটি ও পানির ভৌত রাসায়নিক গুণাগুণ চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এবং জলাশয় বা ঘেরের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এক্ষেত্রে কাঁটা শ্যাওলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘেরের ২০ শতাংশ জুড়ে কাটা শ্যাওলা রেখে বাগদা চিংড়ি চাষ করে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে চাষিরা নিজেরা যেমন লাভ করতে পারবেন পাশাপাশি বাগদা চিংড়ির সুসময় ফিরিয়ে আনতে পারবেন।

বাগেরহাটের কচুয়ার আকাশ মোল্লা। ৫ বছর আগে চিংড়ি চাষ শুরু করেন নিজ ঘেরে। কিন্তু প্রতি বছর চিংড়িতে ভাইরাসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় মারাত্মকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছিলেন। এরপর তিনি চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরামর্শ নেন। সে অনুযায়ী ঘেরের ২০ শতাংশ যায়গায় কাটা শ্যাওলার উপস্থিতিতে চিংড়ি চাষ শুরু করে লাভবান হওয়ার কথা বলছিলেন। শুধু তাই নয়। অন্যদেরও এই পদ্ধতি অনুসরণ করার আহ্বান করেন আকাশ।

আকাশের ঘেরের কর্মচারীরা বলছেন, ঘেরে কাটা শ্যাওলা থাকায় চিংড়ির খাবার অর্ধেক লেগেছে। মাছের উৎপাদনও বেড়েছে। অন্যান্য বারের থেকে এ বছর ৩১ শতাংশ জমিতে ৩ গুণ চিংড়ি উৎপাদন করতে পেরেছেন বলে জানান।

এদিকে চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হওয়ায় এবং চিংড়ির খাবার হিসাবে কাটা শ্যাওলার ব্যবহার নিরাপদ বলে অনেকেই এখন ঘেরে কাটা শ্যাওলা লাগাচ্ছেন অনেক চাষি। ঘেরে কাটা শ্যাওলার উপস্থিতিতে চিংড়ি চাষ করে চষিরা লাভবান হবে, এটাই গবেষকদের প্রত্যাশা।