যশোর অফিস
পাঁচ দশক আগে যশোরের শার্শা উপজেলা উলাশী এলাকার বিস্তীর্ণ জমি বছরের বড় অংশ জুড়ে পানির নিচে থাকত| কৃষকরা ফসল ফলাতে পারতেন না, এলাকায় ছিল তীব্র দারিদ্র্য| এই পরিস্থিতি বদলাতে উদ্যোগ নেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান| তিনি নিজে কোদাল হাতে নিয়ে ১৯৭৬ সালের ১ নভে¤^র খাল খননের সূচনা করেন| তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ¯ে^চ্ছাশ্রমে অংশ নেন সেদিন| মাত্র ছয় মাসের মধ্যে যশোরের শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ উলাসী-যদুনাথপুরে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খনন সম্পন্ন হয়| শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ছিল না| শুধু দুপুরে রুটি ও গুড় খেয়ে তারা কাজ চালিয়ে গেছেন| ফলে ওই অঞ্চলে ঘটে কৃষি বিপ্লব|
তবে বর্তমানে সেই খালটি মৃতপ্রায়| যশোরের শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ উলাসী-যদুনাথপুরে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ সেই খালটির প্রাণ ফেরাতে বাবার মতো কোদাল হাতে এবার খাল খনন করবেন ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান| আগামী ২৭ এপ্রিল তিনি খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে শার্শাবাসীর মধ্যে আনন্দ উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছে| প্রবীণরা প্রায় ৫ দশক আগের সেই স্মৃতিচারণ করছেন|
উলাশী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উলাশী ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অবহেলিত স্মৃতিস্তম্ভ| খালের ধারে গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকা ফলকে খোদাই করা আছে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগের কথা- উলাশী-যদুনাথপুর বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প| ১৯৭৬ সালের ১ নভে¤^র এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান|
ফলকের অপর পাশে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকল্প শেষে তিনি আবারো এখানে আসেন| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গৌরবময় স্মৃতি আজ অনেকটাই ম্লান| পাশের একতলার পুরোনো ভবনটি পরিত্যক্ত, জানালা-দরজা নেই, চারপাশে ঝোপঝাড়| আর যে খাল একসময় কৃষিতে বিপ্লব এনেছিল, সেটি এখন প্রায় ভরাট হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে| তলানিতে একটু পানি|
৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ১ নভে¤^র নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে মাটি কেটে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান| তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলে দলে ¯ে^চ্ছাশ্রমে খাল খননে অংশ নেন সাধারণ মানুষ| ৬ মাসে খাল খনন সফল হয়| ৬ মাস পর ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান|
উলাসী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আবদুল বারিক মণ্ডল স্মৃতিচারণ করে বলেন, খাল খনন কর্মসূচির সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে করে এসে স্কুল মাঠে অবতরণ করেন| এরপর তিনি হেঁটে এসে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়িতে ভরেন| সেই ঝুড়িটি তিনি তার (আব্দুল বারিক) ভাই করিম বকস মন্ডল মে¤^ারের মাথায় তুলে দেন| এমনকি তার ভাইয়ের মাথার টোকাও (মাথাল) রাষ্ট্রপতি নিজেই পরে নেন| খাল খননের উদ্বোধনী দিনে সেখানে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছিল| পরবর্তীতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ছাড়াও সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা এ কাজে অংশ নেন|
তিনি আরও জানান, হাজার হাজার মানুষ কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই খাল কাটার কাজে যুক্ত হয়েছিলেন| কাজের বিনিময়ে তাদের শুধু দুপুরে রুটি ও গুড় দেওয়া হতো| খালের পাড়ে একতলা ওই ভবনে রুটি ˆতরি করা হতো, আর সেটাই খেয়ে সবাই কাজ চালিয়ে যেতেন| রাষ্ট্রপতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই মানুষ ¯^তঃস্ফূর্তভাবে এ কাজে অংশ নিয়েছিল|
আবদুল বারিক মণ্ডল জানান, উত্তর শার্শা এলাকার পাঁচটি বড় বিলের পানি আগে ঠিকভাবে নিষ্কাশন হতো না| ফলে হাজার হাজার বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে থাকত এবং বেতনা নদীর পানি বের হতে না পারায় প্রায়ই ফসলের ক্ষতি হতো| এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে চরম অভাব-অনটন দেখা দিত| পরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর উলাশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত বেতনা নদীর সঙ্গে সংযোগ করে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়| এই উদ্যোগের ফলে পানি নিষ্কাশন ¯^াভাবিক হয় এবং খালের পানি সেচ কাজে ব্যবহার করে কৃষকরা উপকৃত হতে থাকেন| ফলে এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে|
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন খালটি সংস্কার না করায় অনেক অংশ ভরাট হয়ে গেছে| শুনছি জিয়াউর রহমান সাহেবের ছেলে আমাদের তারেক রহমান আবার এ খাল খনন করবেন| এতে এলাকার মানুষের আবারও উপকার হবে|
জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি বাবার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তখনকার ১৪ বছর বয়সি আবু বক্কর সিদ্দিকী| বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সি আবু বক্কর স্মৃতিচারণ করে বলেন, তার বাবা করিম বকস মণ্ডল ছিলেন তখনকার ইউপি সদস্য| উদ্বোধনের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে একটি ঝুড়িতে ভরে তার বাবার মাথায় তুলে দেন| তার বাবাই প্রথম সেই ঝুড়ি মাথায় করে মাটি সরান|
রাষ্ট্রপতি নিজে মাটি কেটে খাল খননের সূচনা করেছেন- এই খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে| তিনি উল্লেখ করেন, এ অঞ্চলের মানুষের জন্য খাল খনন ছিল অত্যন্ত জরুরি একটি উদ্যোগ|
আবু বক্কর সিদ্দিকী আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জিয়াউর রহমান যশোর সফরে এসে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন| তখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা শার্শা এলাকার মানুষের দারিদ্র্য ও কষ্টের কথা তুলে ধরেন| জবাবে তিনি জানতে চান, কী করলে মানুষের অবস্থার উন্নতি সম্ভব| তখন জানানো হয়, শার্শার পাঁচটি বিলের প্রায় ২২ হাজার একর জমি বছরের বেশিরভাগ সময় পানির নিচে থাকে| এসব বিলের পানি নিষ্কাশন করা গেলে জমিগুলো আবাদযোগ্য হবে এবং খাদ্য উৎপাদন বাড়বে| এতে শার্শা এলাকা খাদ্যে ¯^য়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারবে| এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই তিনি খাল খননের উদ্যোগ নেন এবং নিজেই এর উদ্বোধন করেন|
তিনি আরও জানান, উলাসীতে খাল খননের পর ওই পাঁচটি বিলের প্রায় ২২ হাজার একর জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ শুরু হয়| পাশাপাশি খালের দুই পাশে সেচের জন্য প্রায় ২০টি পাম্প স্থাপন করা হয়| এর ফলে এ অঞ্চলে ইরি (বোরো) ধানের চাষের প্রচলন ঘটে| খাল খনন কর্মসূচি সফল হওয়ায় এলাকাটি ধীরে ধীরে খাদ্যে ¯^য়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে|
উলাসী গ্রামের বাসিন্দা আহমদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় খাল মরে গেছে| পুনরায় খাল কেটে সচল করতে হবে| তাহলে এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছেন| তার বাবার খনন করা খালটি আবার সচল হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা|
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, উলাসী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| আগামী ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন| আশা করছি মৃতপ্রায় খালটি প্রাণ ফিরে পাবে|
খাল পুনঃখনন উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে যশোর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছরে উলাশী-যদুনাথপুর খাল সংস্কার না করায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে| সেই খাল পুনঃখনন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার| ৫০ বছর আগে জিয়াউর রহমানের নিজে হাতে কোদাল নিয়ে খনন করা সেই খালটি পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনে আগামী ২৭ এপ্রিল আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান| আমরা সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি|










































