বাপী দে।।
খুলনার এক সময়ের খরস্রোতা নদী শোলমারী| যেখানে চলাচল করেছে বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ-স্টিমারসহ বিভিন্ন বড় নৌযান| বটিয়াঘাটা-ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষি ও কৃষকের কাছে প্রাণ ছিল প্রমত্তা নদীটি| সময়ের ব্যবধানে সেই দাপুটে নদীই আজ ছোট সরু নালায় পরিণত হয়েছে| দু’পাশ জুড়ে বিশাল চড় আর দখলের চিহ্ন নিয়ে টিকে কোনমতে অস্তিত জানান দিচ্ছে শোলমারী| ফলে স্থানীয়ভাবে কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে|
স্থানীয়রা শোলমারী নদী খনন, আমতলা ও খড়িয়াসহ সব খাল ইজারা বন্ধ এবং নেট-পাটা ও বাঁধ অপসারণ করে কৃষির জন্য উন্মুক্ত করারা দাবি জানিয়েছেন|
সরজমিন ঘুরে ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বটিয়াঘাটা উপজেলার কাজীবাছা নদী থেকে শোলমারি নদীর উৎপত্তি| বিল ডাকাতিয়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ও পঞ্চু নদীর মধ্য দিয়ে এটি সালতা নদীর সঙ্গে মিশেছে| এরপর আবার জলমার কাছে কাজীবাছা নদীতে মিলিত হয়েছে| বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা, বটিয়াঘাটা সদর, গঙ্গারামপুর ও সুরখালী ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী ডুমুরিয়া উপজেলার উত্তর ডুমুরিয়া বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে শোলমারী নদী| এক সময় এই নদীর প্রশস্ততা ছিল প্রায় ৫০০ ফুট| গত ৮-১০ বছর আগে থেকে নদীটির ওপর বিপর্যয় শুরু হয়|
অবশ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, শোলমারি নদীর ˆদর্ঘ্য দেওয়া আছে ২৯ কিলোমিটার| প্রস্থ ১৫০ মিটার, গড় গভীরতা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার| বাস্তবে জোয়ারে নদীর পানি দু’পাড় প্লাবিত করলেও ভাটার সময় নদীর সরু নালা দিয়ে সহজেই মাঝ থেকে হেঁটেও যাওয়া যায়| আর এখন নদীর প্রস্থততা কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন থেকে চার ফুটে|
বটিয়াঘাটার বাসিন্দা ব্যবসায়ী দীপক কুমার সাহা| তিনি বলেন, মাত্র ৯-১০ বছর আগেও নদী এপার থেকে ওপার যেতে ভয় করতো| তীব্র স্রোত ছিল| বাতাসে ভয়ঙ্কর রূপ নিতো| ভরা বর্ষা ছিল আতংকের| অথচ এখন সেখানে সরু নালা| গবাদি পশু চড়ে বেড়ায়|
স্থানীয় কৃষক মো. মনসুর আলী শেখ, মো. ফজলুর রহমান লাভলু, বন্দনা রায়, আরনী সরকারসহ অন্যরা জানান, শোলমারী নদী নেই| এটি এখন সরু নালা| ১৯৯৬ সালে নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণ হয়, তখনো কাজ করতে হিমশিম খেতে হয়েছে| ব্রিজ নির্মাণে পর ধীরে উজানের পানির চাপ না থাকায় পলি পড়ে চর জেগে মূল নদী নালায় পরিণত হয়েছে|
তারা জানান, শোলমারী নদীর মুখে রয়েছে ১০ ভেন্টের (কপাট) স্লুইস গেট থাকলেও কাজে আসছে না| এখানে সঠিক সময় পানি সরবরাহসহ নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়| এছাড়া ইটভাটা, বিভিন্নস্থানে প্রভাবশালীরা চর দখল করায় নদীটি অস্তিত হারাচ্ছে| এক সময়ে এখানে নদীর চিহ্নও থাকবে বলে মনে হয় না|
কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন লোকজ| প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দেব প্রসাদ সরকার জানান, ‘বটিয়াঘাটা অন্যতম কৃষি প্রধান অঞ্চল| এখানে শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী| তারা নদী ও খালের পানি ব্যবহার করে আমন, আউশ ও বোরো ধান, তরমুজ, কুমড়া, তিল, মুগডালসহ সব ফসল চাষ করেন| আমরা দীর্ঘদিন ধরে শোলমারী নদী খনন, আমতলা ও খড়িয়াসহ সব খাল ইজারা বন্ধ এবং নেট-পাটা ও বাঁধ অপসারণ দাবি করে আসছি| শোলমারী নদীটি এখন বাঁচানো জরুরি হয়ে পড়েছে|
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার বিভাগীয় সমš^য়ক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী নদী ‘জীবন্ত সত্ত্বা’| কিন্তু কোনভাবেই নদীকে রক্ষা করা যাচ্ছে না| আমরা চাই, শোলমারীসহ খুলনা অঞ্চলের নদ-নদী, খালগুরো পরিকল্পিতভাবে খনন করা হোক| একই সঙ্গে সেগুলো অবৈধ দখলদারমুক্ত করে কৃষক-মৎস্যজীবীদের ব্যবহারের জন্য উম্মুক্ত করতে হবে|’










































