ঢাকা অফিস
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে কখন, কিভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সেই বর্ণনা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন দুই প্রত্যক্ষদর্শী। এই দুজনের একজন বর্তমানে বেরোবির সাবেক শিক্ষার্থী রিনা মুর্মু (২৯)। অন্যজন সাংবাদিক এ কে এম মঈনুল হক (৫৮)।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে বুধবার (৬ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দেন তারা।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার এই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ট্রাইব্যুনালের সদস্য। এই দুজনকে নিয়ে এখন পর্যন্ত পাঁচজন এ মামলায় সাক্ষ্য দিলেন। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১৭ আগস্ট ধার্য করা হয়েছে।
বোরোবি থেকে গত বছর অর্থনীতিতে মাস্টার্স শেষ করা রিনা মুর্মু এ মামলায় চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন। রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে অভ্যুত্থান পর্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ট্রাইব্যুনালকে আন্দোলনের ধারাবাহিক বর্ণনা দেন রিনা মুর্মু।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের আগে ঘটনাস্থলে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত বছর ১৬ জুলাই আমরা আন্দোলনের জন্য দুটি স্থান নির্ধারণ করি।
যার একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেট এবং অন্যটি ছিল লালবাগ। ১৬ জুলাই সকাল ১০টার দিকে জেলা স্কুলের সামনে রংপুর শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা মিছিল নিয়ে প্রেস ক্লাবে এলে আমি সেখানে যোগ দিই। পরে আমরা মিছিল নিয়ে চারতলা মোড়ে যাই। যাওয়ার পথে পুলিশ বাধা দেয়। সেখানে বেরোবি ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়।
আমরা সবাই বেরোবির ১নং গেটে (বর্তমানে শহীদ আবু সাঈদ গেট) একত্রিত হই। সেখানে আগে থেকেই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের লোকজন অবস্থান করছিল।’
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেয় জানিয়ে ট্রাইব্যুনালকে তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকতে গেলে পুলিশ আমাদের বাধা দেয় এবং হঠাৎ করে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। টিয়ারশেল ছোড়ে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। মিছিলে আনুমানিক পাঁচ-ছয় হাজার শিক্ষার্থী ছিল। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের বিপরীতে একটি চায়ের দোকানে গিয়ে আশ্রয় নিই। তখন পুলিশ ও ছাত্রলীগ আবু সাঈদকে লাঠি দিয়ে মারধর করে। আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে রাস্তার ডিভাইডারের একটু সামনে এসে দাঁড়ায়। ১নং গেটে অবস্থানরত দুজন পুলিশ আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি করে। আবু সাঈদ পড়ে যায়। আমাদের সহযোদ্ধা আয়ান আবু সাঈদকে উঠায়। পরে আরো কয়েকজন এসে তাকে পার্কের মোড়ের দিকে নিয়ে যায়।’
রিনা মুর্মু বলেন, ‘পরে আমরা নিরাপদ স্থানে চলে যাই। আমি যেখানে দাড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে আবু সাঈদকে গুলি করার ঘটনা দেখেছি। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে জানতে পারি আবু সাঈদ মারা গেছেন।’
এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, রংপুর মহানগর পুলিশ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করে ট্রাইব্যুনালের কাছে তাদের বিচার দাবি করেন এই সাক্ষী। পরে তাকে জেরা করা হয়।
এরপর এই মামলায় সাক্ষ্য দেন এনটিভির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এ কে এম মঈনুল হক। গত বছর ১৬ জুলাই দুপুর ২টা থেকে বেরোবির ১নং গেটের সামনে পার্কের মোড় এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন ভিডিও জার্নালিস্ট আসাদুজ্জামান আরমান। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সেদিন তাদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সেই বর্ণনাই তিনি তুলে ধরেন সাক্ষ্যে।
মঈনুল হক বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর প্রেস ক্লাব এলাকা থেকে একটি মিছিল নিয়ে বেরোবির ১নং গেটের এখানে আসে। সেখানে আগে থেকেই পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং সরকারি দলের সমর্থকরা ছিল। তারা আন্দোলনকারীদের বাধা দেয়। আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের সামনে সমাবেশ করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তারা (আন্দোলনকারীরা) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে যেতে চায়। এ সময় পুলিশ এবং পুলিশের সঙ্গে যারা ছিল তারা বাধা দেয় এবং পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। আন্দোলনকারীরা নিজেদের বাঁচাতে স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে গুলি করা শুরু করে।’
তখন এনটিভিতে দুপুর ২টার খবর শুরু হয়ে গেছে জানিয়ে সাক্ষী বলেন, ‘আমরা সেখানকার ভীতিকর পরিস্থিতির ভিডিও ফুটেজ এনটিভিতে পাঠাতে শুরু করি। সেই ভিডিও ফুটেজ দেখে এনটিভি কর্তৃপক্ষ আমাকে লাইভে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পর আমরা লাইভে যুক্ত হই। দুপুর ২টা ১৭ মিনিটের দিকে ১নং গেটের সামনে রোড ডিভাইডারের কাটা অংশ দিয়ে কালো টি শার্ট ও প্যান্ট পরা এক যুবক দুই হাত প্রসারিত করে ডিভাইডারের পাশে এসে দাঁড়ায়। সেখান থেকে মাত্র কয়েক গজের দূরত্বে ১নং গেটের সামনে থেকে পুলিশ যুবককে উদ্দেশ্য করে গুলি করে।’
এই দৃশ্য তখন এনটিভির লাইভ সম্প্রচারে দেখানো হয় জানিয়ে সাংবাদিক মঈনুল ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওই যুবক কয়েক পা পিছিয়ে যান এবং বসে পড়েন। বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি তার শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এ সময় কয়েকজন যুবক তাকে সেখান থেকে তুলে পার্কের মোড়ের দিকে নিয়ে যায়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র থেকে তিনি পরে জানতে পারেন গুলিবিদ্ধ যুবকের নাম আবু সাঈদ, বেরোবির ইংরেজি বিভোগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। এদিন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর পান বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান মঈনুল হক।
সাক্ষ্য নেওয়ার পর তাকে জেরা করা হয়। সাক্ষ্য গ্রহণে ট্রাইব্যুনালকে সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। দুই আসামিকে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার সময় ট্রাইব্যুনালে আসামির কাঠগড়ায় ছিলেন মামলার গ্রেপ্তার আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। গত ৩ আগস্ট প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের পর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। এ মামলায় এখন পর্যন্ত পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।








































