Home Lead সম্পদের পাহাড়, তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দিতে ঠিকাদার আজাদের জোর লবিং

সম্পদের পাহাড়, তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দিতে ঠিকাদার আজাদের জোর লবিং

125


সৈয়দ রানা কবীর
টিনশেড বাড়ি থেকে মো: তৌহিদুল ইসলাম আজাদ এখন কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি, জমি ও বিপুল সম্পদের মালিক। গোপালগঞ্জের দরিদ্র পরিবারের সন্তান রূপসায় নৌকায় টাকা তোলা আজাদ এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। ১৯৯১ সালের একটি পুরাতন মোটরসাইকেল থেকে আজাদ এখন নতুন চারটি বিলাস বহুল গাড়ির মালিক। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো: তৌহিদুল ইসলাম আজাদ নামে-বেনামে গেল ১৬ বছরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। চলছে তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলার তদন্ত। আর এসব তদন্ত ধামাচাপা দিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন সুচতুর আজাদ ।
দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাবেক মেয়রের অন্যতম সহযোগী ছিলেন দি আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক তৌহিদুল ইসলাম আজাদ। সাবেক মেয়রের হয়েও আইন লঙ্ঘন করে নামে ও বেনামে কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাবেক মেয়রের আজাদের মত আরো দুইজন সহযোগী রয়েছে। যাদের নিজ নামে রয়েছে একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স। এদের মধ্যে আজাদের মত দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দের অপর দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স ও তাজুল এন্টারপ্রাইজ।খালেকের অন্যতম সহযোগী এই তিন প্রতিষ্ঠান খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ করে শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন অবৈধভাবে। এই সু চতুর আজাদ দীর্ঘ ১৬ বছর পতিত সরকারের শাসনামলে খুলনার শেখ বাড়ির সাথে রেখেছিল সু-নিবিড় সম্পর্ক। ফলে আজাদকে ঠিকাদারিসহ কোন কাজ বাগিয়ে নিতে বেগ পেতে হয়নি।
অভিযোগে জানা গেছে, সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক আইন লঙ্ঘন করে আজাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে অবৈধভাবে প্রায় ৬০ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে দিয়েছে গত কয়েক বছরে।
জনৈক এক ঠিকাদার এইচ এম সেলিম (সেলিম হুজুর) নামে পরিচিত যিনি ছিলেন এসব কাজ দেখাশোনার দ্বায়িত্বে। এ ছাড়াও সাবেক মেয়রকে ৫ শতাংশ কমিশনের ভিত্তিতে আরও প্রায় শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ বাগিয়ে নেন আজাদ তার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে। এর অনেক কিছুই দুদকের তদন্তে বেড়িয়ে আসছে।
দুদক থেকে জানা গেছে, গত ২১ জানুয়ারি দুদকের খুলনার উপ-পরিচালক আবদুল ওয়াদুদকে প্রধান করে অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। এই টিম অনেক তথ্য পেয়েছেন। প্রতিটি বিষয় নিয়ে পৃথক তদন্ত করা হচ্ছে। কেউ পার পাবে না বলে দুদক কর্মকর্তারা জানান। তবে সু চতুর আজাদ এখন দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন দুদকসহ সকল সঠিক তদন্তকে ধামাচাপা দিতে।
দুদকের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ জানান, প্রধান কার্যালয় থেকে চিঠি পেয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। আজাদসহ সাবেক মেয়রের সাথে দুর্নীতিতে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। অনুসন্ধানের জন্য আজাদের বেশ কয়েকজন সহযোগীদের তথ্যও পেয়েছেন তারা। এ এজন্য আজাদের সব সহযোগীদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। মে: আবুল কালাম আজাদ ইতিপূর্বে খুলনার একটি বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি ক্রয়ে ও খুলনার যুবলীগের নেতা হাফিজুর রহমান হাফিজ ( ভূমিদস্যু) হাফিজের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার জমি ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও পতিত সরকারের হয়ে কাজ করেছিলো বলে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীরা অভিযোগ করেন।
খুলনাস্থ নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে একটি কুচক্রী মহল। এতে করে, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বিপাকে পড়েছে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে অধিকাংশ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য আওয়ামী লীগ সমর্থিত। নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান সাবেক কেসিসি মেয়র ও খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক ও ভাইস-চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ও খুলনা-৩ এর সাবেক সাংসদ এস এম কামাল হোসেন এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বোর্ডের অধিকাংশ অনৈতিক কর্মকান্ডে আাজাদের হাত ছিলো বলেও এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। কিন্ত আজাদ সেই তদন্ত ও প্রভাবিত করে ধামাচাপা দিতে জোর লবিং করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অধিকাংশ সদস্য বিগত ১২ বছরে বিশ^বিদ্যালকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। খুলনাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধভাবে টাকা হাতানোর সকল পরিকল্পনা ও মূল হোতা বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ভয়াবহ প্রতারক মো: তৌহিদুল ইসলাম আজাদ। তার একান্ত সহযোগী সৈয়দ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ ও পবিত্র কুমার সরকারকে নিয়ে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সাবেক চেয়ারম্যান তালুকদার আব্দুল খালেক ও এস এম কামাল কে ম্যানেজ করে এসকল অপকর্ম করেতেন তিনি। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে তাদের পপত্নীদেরও রাখা হয়েছে। নানান অনিয়ম সত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বোর্ড অব ট্রাস্টিজের এসকল সদস্যদের কাছে জিম্মি হয়ে ছিলেন, তারা ভয়ে মুখ খুলতেন না। এমনকি বিগত ১২ বছরে কারো কোন প্রমোশন বা বেতন বৃদ্ধি কিছুই হয়নি। বরং কোন কারণ ছাড়াই অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরীচ্যুত করা হয়েছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ কাজের কোন অগ্রগতি হয়নি এই সু চতুর আজাদের কারনে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২২ আগস্ট বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য মোঃ তৌহিদুল ইসলাম আজাদ এর ঢাকাস্থ উত্তরার সেক্টর : ১২, রোড : ৬/বি, এর ১৯ নং বাড়িতে গোপনে ৬৬ তম জরুরী বোর্ড সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় উপস্থিত সকলের সম্মতিতে উদ্বুত পরিস্থিতিতে অতীশ দীপংকর বিশ্ববিদ্যালয়েরও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য, লাইন্স ক্লাবের সাহেক ভাইস-চেয়ারম্যান এবং নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বোর্ড সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরী কে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়। এতে এস এম কামালের ভাইস-চেয়ারম্যান পদ বাতিল করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ২৪ সেপ্টেম্বর ও ১৯ নভেম্বর নগরীর হোটেল সিটি ইন এ বিশ^বিদ্যালয়ের ৬৭ ও ৬৮ তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরী জানান, ১৯ নভেম্বর আওয়ামী দোসর ও ফ্যাসিবাদীরা ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টি ও দোষী প্রশাসনের বহিস্কার ও শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সামনের সড়কে বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভে বিশ^বিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য বোর্ড সদস্য মোঃ তৌহিদুল ইসলাম আজাদ, সৈয়দ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ ও পবিত্র কুমার সরকারকে অপসারণের জোর দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ২০ নভেম্বর শিক্ষার্থীদের অবরোধের মুখে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত তিনজন বোর্ড সদস্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কমিটিতে রেখে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যাদের কাজ চলছে । সুষ্ঠু তদন্ত প্রক্রিয়াকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে, অভিযুক্ত তিনজন বোর্ড সদস্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মোঃ তৌহিদুল ইসলাম আজাদ তার সহযোগীরা প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে বোর্ড সদস্যপদ বহাল রাখার জন্য তদন্ত কমিটির সদস্যদের আর্থিক প্রলোভন দেখানো, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পিছনে লেলিয়ে দেওয়া, মিডিয়াতে ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশসহ বিভিন্ন অপচেষ্টা চালিয়ে চাচ্ছেন তারা।
তিনি আরো জানান, নিয়মতান্ত্রিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১০ ডিসেম্বর তারিখে ৬৯ তম বোর্ড সভা আহবান করা হয়। বোর্ড সভা যাতে পন্ড হয় সেখানেও তারা অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক কারণে অনেকে সভায় আসতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা অনেককে আসতে দিতে চাইছে না। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত বোর্ড সদস্যরা আবার ফিরে আসবনে কিনা? সে পর্যন্ত সকলকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। বৃথা অপচেষ্টা করে কোন লাভ হবে না।
সূত্রমতে, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরী বিশ^বিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান মনোনীত হবার পর তিনি বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। তিনি সেখানে বিগত ১২ বছরে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও বঞ্চনার কথা শুনে জরুরীভাবে সমাধানের আশ্বাস দেন। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি মওকুফ, রিটেক পরীক্ষা ফিস কমানো, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। এতে করে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবৈধ সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগের দোসর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠেছে। তিনি অতি অল্প সময়ে ‘আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন। খুলনা, ঢাকা মিলে অনেকগুলি বাড়ি, একর একর জমির মালিক এই মোঃ তৌহিদুল ইসলাম আজাদ। দলীয় প্রভাব থাকায় তার এসকল অপকর্মের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সে কিছুদিন গাঁ ঢাকা দিয়ে থাকেন।
সিটি কর্পোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে কেসিসি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে টেণ্ডারের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকার রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের নামে কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন তৌহিদুল ইসলাম আজাদ। তার মালিকানাধীন দি আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্স, ৮৯, রেলওয়ে এপ্রোস রোড (স্টেশন রোড), খুলনাকে কালো তালিকায়ভূক্ত করা হয়েছে, যা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তার ঢাকা অফিস : আলহামদুলিল্লাহ, ফ্লাট নং : এ-১, বাড়ী নং : ১৯, রোড নং : ৬/বি, সেক্টর : ১২, উত্তরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা।