রাজু হাওলাদার
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার নিবন্ধন অধিদপ্তর থেকে আগামী দুই বছরের জন্য সংশোধিত মৌজা রেট অনুমোদন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন মৌজা রেট নির্ধারণের পর জমি ক্রেতা-বিক্রেতাসহ এই খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের এমন অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জমির মৌজা রেট বাড়ানোয় সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মধ্যে সমালোচনা। কেনা-বেচা কমায় রাজস্ব হারাবে সরকার।
মৌজা রেট সুত্রে দেখা যায়, নতুন মৌজা রেটে সরকারি হিসাবে প্রতি অযুতাংশ জমির শ্রেণীভিত্তিক মূল্য সর্বনিম্ন ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আবার কোথাও বাড়ির চেয়ে ভিটা শ্রেণির দাম বেশি ধরা হয়েছে। খুলনায় কোন কোন মৌজায় দ্বিগুণ, কোন মৌজায় তিনগুও বাড়ানো হয়েছে। খুবই কমসংখ্যক মৌজায় পূর্বের মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে। এরমধ্যে কিছু মৌজার বেশিরভাগ জমি সরকার আগেই অধিগ্রহণ করেছে।
নিবন্ধক অধিদপ্তরের আদেশে দেখা যায়, জমির বাজারমূল্য নির্ধারণ বিধিমালা ২০১০ (সংশোধিত ২০১২ ও ২০১৫) অনুযায়ী ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য প্রস্তুতকৃত বাজারমূল্য তালিকা ১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী দুই বছরের জন্য কার্যকর করা হয়েছে। সরকারি হিসাবে মৌজা ভিত্তিক জমির সর্বনিম্ন গড় বাজারমূল্য ধরে সংশোধিত মৌজা রেট নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই মূল্যের নিচে জমি রেজিস্ট্রি করা যাবে না।
নতুন নির্ধারণ করা মৌজা মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খুলনা সদর সাব রেজিস্ট্রারের আওতাধীন মৌজার বাস্তু এবং বাণিজ্যিক শ্রেণির মূল্য বাড়ানো হয়েছে অস্বাভাবিকহারে এমনটাই অভিযোগ জমির মালিকদের। খুলনা সদরের বানিয়াখামার মৌজায় বাস্তু শ্রেণির জমির পূর্ব মূল্য ছিল ৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৭৩ টাকা। বর্তমানে তা ১৪ লাখ ৫৯ হাজার ২০৫ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৩ লাখ ৭ হাজার ৪৭৮ টাকা। যা পূর্ব মূল্য থেকে তিনগুণ বেশি। দেখা যায়, বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষ্ণনগর মৌজায় ৭ লাখ ১৬ হাজার ২৫৪ টাকা রেট হয়েছে যা আগের তুলনায় অনেক বেশি।
অপরদিকে, ডুমুরিয়া উপজেলার চকমথুরাবাধ মৌজায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার ৩০২ টাকা রেট হয়েছে যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। এইরকম খুলনার বেশিরভাগ জমির মৌজা রেটই আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে মৌজা রেট অনুযায়ী দেখা যায়।
ডুমুরিয়া সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করতে আসা ভ্যান চালক আজিম শিকদার বলেন, আমি ডুমুরিয়া বিলপাবলা মৌজার ৩ শতক জমি কিনেছি ১ লাখ টাকা দিয়ে কিন্তু সরকারিভাবে আমার দলিলে লিখতে হবে ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা। জমি রেজিস্ট্রি করতে আমার প্রায় ২০ হাজার টাকা লাগবে। কিন্তু আমার ১ লাখ টাকা ক্রয়ের মূল্যে আমি রেজিস্ট্রি করলে ৮ হাজার টাকায় পারতাম। সরকারের উচিৎ শুধু বড় বড় বিল্ডিং দেখে মৌজা রেট বৃদ্ধি করবেন না। তাহলে আমাদের মতো খেটে খাওয়া ভ্যান চালক মানুষ আজীবন মানুষের জমিতে ঘর তুলে থাকতে হবে।
রূপসা উপজেলার সোনালী ব্যাংক কাজদিয়া শাখার হিসাব রক্ষক সুত্রে জানা যায়, যেখানে আগে রেজিস্ট্রির দিন রেজিস্ট্রির পে অর্ডার করতে আমাদের ঘাম ঝড়ে যেত। সেইখানে আমাদের এখন মনেই হয় না যে, রেজিস্ট্রি অফিস খোলা রয়েছে। এমন কোন দিন ছিল না যে দলিল লেখতদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হইত টাকা জমা দেওয়ার সিরিয়ালের জন্য। কিন্তু বর্তমানে মৌজা রেট বৃদ্ধি হওয়ার কারণে রেজিস্ট্রি একদম কম থাকার সোনালী ব্যাংকে দলিল লেখকদের একদমই দেখা যায় না।
খুলনা সদরের দলিল লেখক আঃ সাত্তার শেখ দৈনিক খুলনাঞ্চলকে বলেন, আমি খুলনা সদরের দলিল লিখি দীর্ঘদিন ধরে। আমার সংসার চলে দলিলের কাজ করে। আগের চাইতে দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ খুবই কম। তারপরও আবার চলতি বছরের ১ জানুয়ারিতে অধিকহারে মৌজার রেট বৃদ্ধি করেছে। এখন আর আগের মত রেজিস্ট্রি কাজ নিয়ে আসছে না ক্রেতারা। সরকারের উচিত দেশের সব কিছু পরিস্থিতির কতা বিবেচনা করে মৌজা রেট বৃদ্ধি করা।
তিনি জানান, আগে প্রতিদিন একটি রেজিস্ট্রি থাকলেও এখন সপ্তাহে একটি রেজিস্ট্রিও হচ্ছে না। রেজিস্ট্রি অফিসে আগের তুলনায় রেজিস্ট্রি নাই।
খুলনা বটিয়াঘাটা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), অফিসার শরীফ শাওন দৈনিক খুলনাঞ্চলকে বলেন, আমরা তো দেখি মৌজা রেট আরো কম করেছে জমির বাজার অনুযায়ী। তিনি বলেন, খুলনার জিরোপয়েন্ট এক শতক জমির মূল্য ৩০-৩৫ লাখ টাকা কিন্তু সরকারী মৌজা অনুযায়ী সেই জমির শতক করেছে ৭-৮ লাখ টাকা। তাতে আমাদের কাছে জমির কেনা-বেচার অনুযায়ী সরকার সেইভাবে মৌজা রেট বৃদ্ধি করেননি। জনগনের কথা ভেবেই সরকার সব সময় সিদ্ধান্ত নেন।
ড্রীম টাউন প্রোপার্টিজ এর পরিচালক এস এম মঈনুল ইসলাম বলেন, দীঘদিন যাবৎ জমি ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে না। নতুন রেট বৃদ্ধি হওয়ায় আমাদের কোম্পানীর কেনা বেচা নাই বললেই চলে। শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠান না খুলনার অনেক প্রতিষ্ঠানের এরকমই অবস্থা হয়েছে। গত বছর যে জমি বায়না রেজিস্ট্রি করেছি ৩ লাখ টাকা দরে কিন্তু চলতি বছরে সেই জমি ৫ লাখ টাকা কবলায় উল্লেখ করতে হচ্ছে । এই সব কারণেই অনেক ক্রেতারা বায়নার টাকা ফেরত চাচ্ছেন। দেশের এই পরিস্থিতির মধ্যে এই চলতি বছর মৌজা রেট বৃদ্ধি না করলে ভালো হতো।
খুলনার জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সুত্রে জানা যায়, সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষন করেছেন জেলা রেজিস্ট্রার অফিস। জনগণকে বিপদের মুখে ফেলতে চান না সরকার। জনগনের ভাল খারাপ দিকই সরকার জানেন ও বুঝেন। বর্তমানে যে মৌজা রেট বৃদ্ধি পেয়েছে তা বর্তমান বাজারের তুলনায় ৩ ভাগের ১ ভাগ। সরকারের নিধারিত মূল্য মেনেই জনগণের চলা দরকার। দেশের প্রত্যেক জনগণের উচিৎ সরকারের সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষন করে সরকারকে সাহায্য করা।











































